
শেষ আপডেট: 4 September 2019 14:04
শহরের প্রাণকেন্দ্র, অন্যতম জমজমাট এলাকা বৌবাজারের দুর্গা পিথুরি লেন এবং স্যাকরাপাড়া লেনে গত চার দিন ধরে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে একাধিক বাড়ি। পুরো না ভাঙলেও আগাগোড়া ফাটল ধরছে আরও বহু বাড়িতে। মেট্রো রেল সম্প্রসারণের কাজে মাটির তলায় সুড়ঙ্গ খোঁড়া হচ্ছে, যার জেরে এই আচমকা বিপর্যয়। রবিবার সকালে আচমকাই এলাকার একাধিক বাড়ি খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মাত্র দশ মিনিটের নোটিসে ঘর সপরিবার ঘর ছাড়তে বাধ্য হন কম করে শ'চারেক মানুষ। তাঁদেরই অনিশ্চিত হাহাকারে ভারী হয়ে আছে গোটা এলাকা।
দুর্গা পিথুরি লেনের মুখে ঢুকতেই চোখে পড়ে পুলিশের ব্যারিকেড। মোতায়েন করা পুলিশ কর্মীদের আশপাশে ছোটখাটো ভিড়। সকলেরই একটাই প্রশ্ন, "স্যার, কখন ঢুকতে পারব?" প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রটুকু বার করার জন্য উদগ্রীব তাঁরা।
শাশুড়ি-মা উর্মিলা শায়ের সঙ্গে ঠায় বসে আছেন জ্যোতি শা। বলছিলেন, রবিবার তখন বেলা ১১টা। জলখাবারের পালা চুকেছে, রান্না হচ্ছে দুপুরের। আগের রাতেই গলির একটি বাড়ি ভেঙে পড়েছে, শব্দ পেয়েছেন তাঁরা। বাড়ির পুরুষেরা গিয়ে দেখেও এসেছেন পরিস্থিতি। ফিরে তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন, অসুবিধা নেই তাঁদের বাড়ির কিছু হবে না বলে জানিয়েছেন এঞ্জিনিয়াররা। তাই রবিবার সকাল থেকেই আর পাঁচটা ছুটির দিনের মতোই চলছিল সব কিছু।
কিন্তু কে জানত, আচমকাই বদলে যাবে পরিস্থিতি! ভেঙে পড়ে আরও একটি বাড়ি। ফাটল দেখা যায় আশপাশের বড়-বড় বাড়িগুলিতে। আর তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। এই মুহূর্তে বাড়ি খালি করে দিনস নির্দেশ আসে কড়া গলায়। "একটা উনুনে তখন ভাত হচ্ছে, অন্যটায় তরকারি। ওই অবস্থায় গ্যাস নিভিয়ে বেরিয়ে আসতে হল। একটা কিছু সঙ্গে নিতে পারিনি। আমরা খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম, ভেবেছিলাম এই বাড়িটাও ভেঙে পড়বে বুঝি! তখন বুঝিনি, সতর্কতার জন্য আগে থেকেই বার করে দেওয়া হচ্ছে আমাদের। সতর্কতা কি আর একটু আগে নেওয়া যেত না! একটু আগে আমাদের বলা যেত না বাড়ি ছাড়ার কথা! তা হলে তো অন্তত টাকা-পয়সা, কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে নিতে পারতাম!"-- উদ্বিগ্ন গলায় বলেন জ্যোতি।
একই অবস্থা চৌরাসিয়া পরিবারেরও। ১৯ নম্বর দুর্গা পিথুরি লেনের গৃহবধূ সঙ্গীতা চৌরাসিয়ার তিন ছেলেমেয়ে। ছুটির দিনে সকলেই বাড়িতে। আর আছেন অসুস্থ ও বৃদ্ধা মা, প্যারালাইজ়ড বোন। ভেঙে পড়া স্বরে বললেন, "কিচ্ছু টের পাইনি আমরা। না কোনও শব্দ, না কোনও কাঁপুনি। শুধু শুনেছিলাম, আগের দিন রাতে নাকি ভেঙে পড়েছে অন্য একটা বাড়ি। মেট্রোর কাজ, মাটি আলগা-- এত বুঝিইনি। নানা রকম গুজব ছড়াচ্ছিল এই ভাঙা নিয়ে। আমরা তো জানতামই না, আমাদের বাড়ির তলা দিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ছে মেট্রো! জানলে হয়তো সতর্ক থাকতাম! ছেলেমেয়েদের বইখাতা, আমার গয়নাগাঁটি, টাকাপয়সা-- সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হল! এক আত্মীয়ার কাছ থেকে কাপড়জামা নিয়ে এসে পরছি কোনও রকমে।"
সঙ্গীতা, জ্যোতি-- এঁরা সকলেই সপরিবারে রয়েছেন চাঁদনি চক ও ধর্মতলা এলাকার কয়েকটি হোটেলে। জ্যোতির দুই ছেলেমেয়ে ছোট। বাইরের খাবার খাওয়ার অভ্যেস নেই, হোটেলের খাবারে শরীর খারাপ করছে তাদের। শুধু খাওয়া নয়। পাঁচ-ছ'জনের জন্য বরাদ্দ একটি বা দু'টি করে ছোট ছোট রুম। সঙ্গে নেই কোনও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস! চার দিনেই যেন দুর্বিষহ ঠেকছে তাঁদের কাছে।
তবে তাঁদের আশঙ্কা অন্য। আজ তো না হয় চার দিন কাটল। এভাবে আর কত দিন? তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তর এখনও দেননি কেউই। ঠিক কত দিন হোটেলে থাকতে হবে এভাবে, হোটেলের পরেই বা কোথায় যাবেন, সরকার নতুন থাকার জায়গা দিলেও সেটা কোন এলাকায় হবে-- এ সব সাত-পাঁচ চিন্তায় জেরবার সক্কলে।
বৌবাজার এলাকার স্যাকরাপাড়া লেনেও একই অবস্থা। ওই গলির সেন পরিবারের বাড়ি ভেঙে পড়েছে। তাঁদের পশু-পাখি পোষার শখ ছিল। সারা বাড়িতে পোষা অসংখ্য দেশি-বিদেশি পাখি। রয়েছে চারটি কুকুরও। বাড়ি ভেঙে পড়ার আগে, কুকুরগুলিকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন কেবল।
এমব্যাসি হোটেলের আট নম্বর ঘরে মালিক পরিবারের সঙ্গেই রয়েছে তারা। বিপর্যয়ের কথা ভেবে অনুমতি দিয়েছেন হোটেল কর্তৃপক্ষও। কিন্তু বৌবাজারের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই রয়ে গিয়েছে তাঁর প্রিয় পাখিগুলো। প্রায় ৬০-৭০টি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আদৌ বেঁচে রয়েছে কি না, তা জানা নেই।
সেন পরিবারের অভিযোগ, "একটু আগে আন্দাজ পেলে সব কিছুর ব্যবস্থা করতে পারতাম গুছিয়ে। এখন আমরা তো কোনও না কোনও ভাবে সারভাইভ করে যাব। কিন্তু ওদের তো কোনও দোষ ছিল না।"