
শেষ আপডেট: 10 June 2020 18:30
কঠিন, তরল, গ্যাসের পরে পদার্থের ‘ফোর্থ স্টেট’ বা চতুর্থ দশা হল প্লাজ়মা। এই অবস্থায় অতি উচ্চ তাপমাত্রায় ইলেকট্রন অণুতে আটতে না থেকে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। অর্থাৎ ইলেকট্রনের যে স্রোত তৈরি হয় সেখানে প্রোটন বা অন্য কণারা ভেসে থাকতে পারে। এর বাইরেও যে পদার্থের আরও একটা অবস্থা থাকতে পারে তার ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বোস ও অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। সেটা ১৯২৪-২৫ সাল। তাঁরা বলেন, পরম শূন্য তাপমাত্রা ‘০’ কেলভিন বা মাইনাস ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পৌঁছলে পদার্থের কণার মধ্যে তরঙ্গ ধর্ম দেখা যায়। তারা সব গুণাগুন, চরিত্র হারিয়ে একটি কণার মতো ব্যবহার করে। এই অবস্থাকেই বলা হয় ‘কোয়ান্টাম অবস্থা’ বা পদার্থের পঞ্চম অবস্থা। তরঙ্গ যেমন অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে তেমনি কোয়ান্টাম কণাও একই সঙ্গে এবং একই সময় অনেক জায়গায় বা অবস্থায় থাকতে পারে। এই তথ্যকেই বলে ‘বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট’ বা BEC।
১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্ল ওয়াইম্যানের ল্যাবরেটরিতে রুবিডিয়াম পরমাণুর গ্যাসের মধ্যে প্রথম এই কোয়ান্টাম কণার খোঁজ মেলে। একই বছর ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষণাগারে সোডিয়াম পরমাণুর গ্যাসের মধ্যে এই কণার খোঁজ পান বিজ্ঞানীরা। গবেষণাগারে কোয়ান্টাম কণার অস্তিত্ব প্রমাণ করে ওই বছরই নোবেল পেয়েছিলেন কলোরাডো ইউনিভার্সিটির এরিক কর্নেল এবং কার্ল ওয়েইম্যান। তারপর থেকেই বিশেষ উপায় পদার্থকে ঠাণ্ডা করে চরম শূন্য তাপমাত্রায় নিয়ে গিয়ে এই কোয়ান্টাম কণার খোঁজ শুরু করেন বিশ্বের নানা প্রান্তের পদার্থবিজ্ঞানীরা।
সত্যেন্দরনাথ বসুর ‘বোসন’ কণার ধর্মের উপর ভিত্তি করেই আইনস্টাইট পদার্থের এই দশার কল্পনা করেছিলেন। বোস এবং আইনস্টাইন দুজনেই ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে পদার্থের কণার তরঙ্গ ধর্মও রয়েছে। ১৯১৬ সালের জেনারাল থিয়োরি অব রিলেটিভিটি-র সৃষ্টি করেছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। এই আবিষ্কার ছিল ক্ল্যাসিকাল থেকে কোয়ান্টাম-এ উত্তরণ।
বৃহস্পতিবার নাসার বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে দেখান আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে শূন্য মাধ্যাকর্ষণের মধ্যে যদি সেই চরম শূন্য তাপমাত্রায় পৌঁছনো যায় তাহলে পদার্থের কণা আলাদা হয়ে তার মধ্যে তরঙ্গ ধর্ম প্রকাশ পায়। অর্থাৎ কোয়ান্টাম কণা তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বেশি চাপমাত্রায় পদার্থের অনু ও পরমাণু প্রচণ্ড গতিতে ছুটতে থাকে। তাপমাত্রা যত কমানো হয় অণু ও পরমাণুর গতিশক্তিও কমতে থাকে। গ্যাসীয় পদার্থ ঠাণ্ডা হয়ে তরল হয়। আরও ঠাণ্ডা করলে জমে কঠিন অবস্থায় পৌঁছয়। খুব কম তাপমাত্রায় অর্থাৎ শূন্য কেলভিন বা মাইনাস ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পদার্থের ধর্ম পুরোপুরি বদলে যায়। অণু, পরমাণু ও ইলেকট্রনের মতো কণার গতি তখন ক্ল্যাসিকালের নিয়ম মেনে বার করা যায় না, বরং কোয়ান্টামের তত্ত্ব দিয়ে বুঝতে হয়। কারণ তখন তারা সম্পূর্ণ অন্য জগতে চলে যায়। অর্থাৎ ‘বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট’ বা ‘BEC’ দশায় পৌঁছে যায়। তাপমাত্রা যত কমতে থাকে, ওই গ্যাসের মধ্যে তত বেশি সংখ্যায় পরমাণু নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব হারিয়ে কোয়ান্টাম জগতে ঢুকে পড়ে।
আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে পদার্থকে এই কোয়ান্টাম দশার গবেষণায় ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানী রবার্ট থম্পসন। তিনি বলেছেন, শূন্য মাধ্যাকর্ষণ এই গবেষণায় বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন। কারণ এখানে পার্থিব মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার পড়েনি। নাসা জানাচ্ছে, এবার কোয়ান্টাম পদার্থকে আরও ঠাণ্ডা অবস্থা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হবে। এই কোয়ান্টাম দশাকে কাজে লাগিয়েই সূক্ষাতিসূক্ষ সময়-গণনা বা অন্যান্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজ শুরু করা যাবে।