
শেষ আপডেট: 12 October 2023 14:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো, বাঁকুড়া: মুর্ছা পাহাড় থেকে শোনা গেল কামানের গর্জন। এক বার নয়, দু'বার নয়, রবিবার সকালে ন'বার শোনা গেল তোপধ্বনি। এ কোনও যুদ্ধের ইঙ্গিত নয়। শারদোৎসবের ১৫ দিন আগেই শুরু হয়ে গেল মল্লরাজ কূলদেবী মৃন্ময়ীর পুজো। প্রায় ১০২৭ বছরের পুরনো এই পুজোয় এটাই রীতি।
রাজপাট নেই। রয়েছে ভাঙাচোরা রাজবাড়ি। প্রতিবছর এই প্রাচীন রীতি মেনে বাঁকুড়ার দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। 'পট পুজো'ই এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শহরের শাঁখারি বাজারের ফৌজদার পরিবারের সদস্যরা ঐতিহ্য বজায় রেখে প্রতি বছর বড় ঠাকুরাণী, মেজ ঠাকুরাণী ও ছোটো ঠাকুরাণীর আলাদা-আলাদা তিনটি পট আঁকেন। মন্দিরে দেবী মৃন্ময়ী প্রতিমার পাশেই নির্দিষ্ট জায়গায় এই তিনটি পট রেখে পুজো হয়।
রাজ পরিবারের সদস্য জ্যোতিপ্রসাদ সিংহ ঠাকুর জানিয়েছেন, প্রাচীন প্রথানুযায়ী, দেবী পক্ষের চতুর্থীর দিন থেকে মেজ ঠাকুরাণী অর্থাৎ দেবী মহালক্ষ্মী, সপ্তমীর দিন থেকে ছোটো ঠাকুরণী অর্থাৎ দেবী মহাসরস্বতীর পুজো শুরু হয়। এখানে বড় ঠাকুরাণী মহাকালী। এই তিনদেবীকে মহামায়ার রূপ হিসেবে মল্লরাজাদের হস্ত লিখিত বলীনারায়ণী পুথি অনুযায়ী পুজো করা হয়।
একসময় মল্ল রাজত্বের রাজধানী ছিল জয়পুরের প্রদ্যুম্নপুরে। ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে মল্ল রাজ জগৎমল্ল শিকারের সন্ধানে ঘন জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে ছিলেন আজকের বিষ্ণুপুরে। কথিত আছে, ক্লান্ত হয়ে রাজা যখন একটি বট গাছের নীচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, সেই সময় তাঁর সঙ্গে একাধিক অলৌকিক ঘটনা ঘটে।
জনশ্রুতি রয়েছে, যে ওইসময় জগৎমল্লর সামনে দেবী মৃন্ময়ী প্রকট হয়েছিলেন। তিনি রাজাকে বিষ্ণুপুরে রাজধানী স্থানান্তরিত করা নির্দেশ দেন। সঙ্গে মৃন্ময়ীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করতে বলেন। এরপরেই জগৎমল্ল রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। দেবীর নির্দেশ মেনে প্রাসাদ লাগোয়া বিশাল মৃন্ময়ী মন্দির গড়ে তুলে পুজো শুরু করেন। এর পর থেকে প্রসারিত হতে থাকে মল্ল রাজের প্রভাব। বৈভব আর আভিজাত্যের ছোঁয়া লাগে মৃন্ময়ীর পুজোতেও।
এই রাজ পরিবারের সদস্য তনিমা সিংহ ঠাকুর জানিয়েছেন, রাজবাড়ির পুজো হওয়ায় এ বাড়ির আচার, রীতিও কিছুটা আলাদা। পুজোর পনেরো দিন আগে জীতাষ্টমীর পরের দিন নবমী তিথিতে শুরু হয় মৃন্ময়ীর পুজো। সেই নিয়ম মেনেই রবিবার পুজোর সূচনা হয়ে গেল।
স্থানীয় একটি পুকুরে পুজো করে রাজ পুরোহিত বড় ঠাকুরাণীর পট মৃন্ময়ীর মন্দিরে নিয়ে আসেন। এই পট পুজো করে মন্দিরে আনার প্রতিটি নির্ঘণ্ট ঘোষণা করার জন্য প্রথা মেনেই তোপধ্বনি করা হয়েছে। এই ভাবেই শুরু হয়ে গেল মল্ল রাজ পরিবারের কূলদেবী মৃন্ময়ীর পুজো। মল্ল রাজত্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আগমনীর বার্তা।
পুজোর দিনগুলিতে মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরে পর্যটকদের ঢল নামে। প্রাচীন ঐতিহ্য আর পরম্পরার সাক্ষী থাকতে আজও জেলা, রাজ্য, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশ থেকেও প্রচুর মানুষ উপস্থিত হয়েছেন এখানে।