
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 27 November 2024 13:38
চন্দন ঘোষ, পূর্ব বর্ধমান
একসময় ছুরি কাঁচির জন্য বিখ্যাত বর্ধমানের কাঞ্চননগরে এখন অন্য আকর্ষণ। ঘুরে আসতে পারেন ডিএন দাস হাইস্কুলে। দিনের আলোতেই দেখে আসতে পারেন প্যাঁচাদের সংসার। স্কুলের হেডস্যারের তত্ত্বাবধানে ৩০টি প্যাঁচা এখানে খায়, দায়, বাচ্চা দেয়। হেড স্যারের কথাও দিব্যি শোনে তারা। তাঁর ডাকে সাড়া দেয়। পঠনপাঠন ও স্কুলের কাজকর্ম সামলানোর পাশাপাশি একরাশ পশুপাখি নিয়ে দিব্যি আছেন স্কুলের প্রধানশিক্ষক সুভাষচন্দ্র দত্ত।
আদতে বিজ্ঞানের শিক্ষক সুভাষচন্দ্র দত্ত। জানালেন, প্যাঁচারা নাকি বাদুড় খেয়ে এই এলাকার কোভিড নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্যাঁচাদের এই ভূমিকা বিদেশী সায়েন্স জার্নালেও তুলে ধরেছেন তিনি। এছাড়াও বাস্তুতন্ত্রের একেবারে উপরে থাকে প্যাঁচা। প্যাঁচাদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, আগে তাঁর স্কুলে মিড-ডে মিলের রুম খুব নোংরা করত ইঁদুর৷ তাঁরা নাজেহাল হয়ে যেতেন পরিষ্কার করতে গিয়ে৷ এখন পেঁচা আসার পরে সেই রুমই ঝকঝকে, ইঁদুরের টিকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷ যখন তখন সাপ বেড়িয়ে পড়ত স্কুল চৌহদ্দিতে। বাচ্চাদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় থাকতে হত তাদের। পেঁচা আসার পরে তাও পুরো বন্ধ৷
শুধু প্যাঁচাই নয়, স্কুলের বটগাছকে মাঝে রেখে তিনি তৈরি করেছেন পাখিরালয়। সেখানে আছে ছাতারে, গোলা পায়রা, শালিখ, চড়ুই। আর আছে কাঠবিড়ালি, মেঠো ইঁদুর, ছুঁচো, বেজি। আছে একগাদা বাদুড়, চামচিকেও। সুভাষবাবু মনে করেন পরিবেশকে না চিনলে ছাত্রদের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। তাই নিজের স্কুলে সেই চেষ্টাই করেন তিনি। তাঁর স্কুলের ৬০০ ছাত্রছাত্রীর সাথে এই প্রাণীদের কোনও সংঘাত নেই। বরং এই পরিবেশ থেকেই শিখছে তারা। সুভাষচন্দ্রবাবুর কথায়, "এটাই জয়ফুল লার্নিং। আনন্দপাঠ।"
সুভাষবাবু জানালেন, একাজ তিনি একা করেন না। সবসময় পাশে পান তাঁর সহকর্মীদের। আছেন একজন কেয়ারগিভারও। তাছাড়াও এগিয়ে আসেন ছাত্রছাত্রীরাও। বললেন, "আমি ক্লাস ফাইভ, সিক্স ও সেভেনের ছাত্রদের দায়িত্ব দিয়েছি, পেঁচাদের দেখভাল করার জন্য৷ ওরাই ক্লাসের একটি পুরোনো বেঞ্চ দিয়ে পেঁচার বাসা বানিয়ে দিয়েছে। এ ভাবেই ছাত্রদের মধ্যে নানা উদ্ভাবনী শক্তির জন্ম হচ্ছে।"
শিক্ষকতায় জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন বর্ধমানের ডিএন দাস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সুভাষচন্দ্র দত্ত। ২০১৯ এর শিক্ষক দিবসে দেশের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন। সুভাষচন্দ্র জানান, তাঁর উদ্ভাবনী পরিকল্পনার কথা শুনে উৎসাহিত হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। বলেন, 'উনি অবাক হয়ে যান আমার পরিকল্পনা শুনে৷ প্রায় মিনিট খানেক আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন৷ প্রচুর উৎসাহ দিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন৷ সব বাধা অতিক্রম করে আমাকে এগিয়ে যেতে বলেছেন৷ এটাই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি৷'
কী ভাবে তাঁর স্কুলে পাঠ আর প্রকৃতির মেলবন্ধন হচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সামনে তুলে ধরেছিলেন সুভাষচন্দ্র। তিনি বলেন, "আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞানের সাথেই ওঠাবসা। পাখি, কাঠবেড়ালির সঙ্গে কথাবার্তা বলা মানে জীববৈচিত্র বজায় রাখা৷ আমার স্কুলে যে লক্ষ্মী প্যাঁচারা রয়েছে, তারা পরিবেশে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে৷"
সুভাষচন্দ্র দত্ত ক্যান্সার রোগী। নিয়মিত চিকিৎসা চলে। তবুও রোগের কাছে মাথা নত করেননি তিনি। প্রকৃতি থেকেই বাঁচার রসদ নিংড়ে নিয়েই দিনলিপি লেখেন তিনি।