পাড়াকাঁপানো কামানের শব্দ আজ অতীত, প্রথা মেনে সূচনা হল ‘বন্দুকবাড়ি’র দুর্গাপুজোর
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুর্গাপুজোর সূচনা হল জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে। প্রতিবারের মতো রথের দিন ঠাকুরদালানে জবা ফুলের মালা দিয়ে গরান কাঠ পুজোর মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় ‘বন্দুকওয়ালা’ দাঁ বাড়ির। এবছরও তাঁর ব্যাতিক্রম হয়নি। এবার শুরু হয়
শেষ আপডেট: 12 July 2021 16:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুর্গাপুজোর সূচনা হল জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে। প্রতিবারের মতো রথের দিন ঠাকুরদালানে জবা ফুলের মালা দিয়ে গরান কাঠ পুজোর মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় ‘বন্দুকওয়ালা’ দাঁ বাড়ির। এবছরও তাঁর ব্যাতিক্রম হয়নি। এবার শুরু হয়ে যাবে প্রতিমা তৈরির কাজ। এবার পুজোর ১৬২ বছর।
সিপাহী বিদ্রোহ সদ্য থেমেছে তখন। বন্দুকের একচেটিয়া ব্যবসায় প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটিশ বন্দুক কোম্পানিদেরও সেসময় টেক্কা দিয়েছিলেন এই বাঙালি ব্যবসায়ী। ১৮৫৯ সাল। নরসিংহ দাঁয়ের উদ্যোগেই শুরু হল বাড়িতে মাতৃ আরাধনার। তবে দেবী এ বাড়িতে ‘মা’ নয়, পূজিত হন ‘কন্যা’ হিসেবে। চারদিনের জন্য উমা আসেন। থাকেন যত্নে–আদরে।

প্রতিপদের দিনই বোধন হয় দেবীর। সপ্তমীতে শুরু হয় পুজো। তবে পুজোর আচার এবং আয়োজন দেখলে হঠাৎ থমকে যাবে সময়। ফিরে যাবে দেড় শতক আগের কোনও উপন্যাসের পাতায়। কারণ, সপ্তমীর ভোরেই দাঁ বাড়ি থেকে শুরু হয় এক বর্ণময় শোভাযাত্রা। শুরুতে থাকে কলাবউ। তার পিছনে পরিবারের সদস্যরা। আগে বন্দুক ও তরবারিবাহী প্রহরীরা থাকতেন। গঙ্গা থেকে কলাবউ স্নান করিয়ে এনে প্রতিষ্ঠা করা হত ঠাকুরদালানে। তবে করোনা সংক্রমণের জন্য গতবছর থেকেই সেসব এবছর আর হচ্ছে না।
আগে কলাবউয়ের স্নানের পর সপ্তমীর সকালে কামানের শব্দে কেঁপে উঠত পাড়া। ১৭ ইঞ্চির ছোট্ট উইঞ্চেস্টার কামান গর্জে ওঠার পরই শুরু হত পুজো। কামানের পাশাপাশি একের পর এক বন্দুকের স্যাল্যুটও থাকত দেবীর জন্য। সেসবের পাটও চুকে গেছে অনেকদিন আগে। বাড়ির কোনো মেয়ের বিয়ে হলে বা নববধূ এলেও দাঁ বাড়িতে গান স্যালুট দেওয়া হত।
সময়ের সঙ্গে অনেকটাই বদলেছে রেওয়াজও, আগে কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হত ঘাটে। কিন্তু এখন গাড়ি করেই নিয়ে যাওয়া হয় দেবীকে। বিসর্জনও হত নদীর ঠিক মাঝখানে। জোড়া নৌকায় করে মাঝগঙ্গায় গিয়ে হত ভাসান। এখন তা আর সম্ভব হয় না।

বন্ধ হয়েছে আরও একটা রীতি। পার্বতীর যাত্রার খবর কৈলাসে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকণ্ঠ পাখি। বন্ধ সেই ঐতিহ্যও। বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত আইন নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো নিষিদ্ধ করে দিয়েছে অনেক বছর আগেই। ফলে সেটা বন্ধ হয়ে গেছে বহু বছর হল। তবে অপরিবর্তিত আছে সাবেকিয়ানা। অপরিবর্তিত আছে দেবীর আরাধনা, রীতি-রেওয়াজ। শতাব্দীপ্রাচীন এই দাঁ-বাড়ির পুজো এখনও ধরে রেখেছে ইতিহাসের খণ্ডচিত্রকে।
পরিবারের সদস্যদের তরফে জানানো হয়েছে, করোনা আবহে গত বছরের মতো এ বছরও পুজোটি কেবলমাত্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রতিমার উচ্চতাও কমানো হচ্ছে। এখন পুজোর জন্য গরান কাঠও পাওয়া যায় না। এরপর থেকে হয়ত প্রথা ভেঙে হয়তো অন্য কাঠে কাজ চালাতে হবে। ‘বিশ মণি’ নৌকা বা সেই বাহকরাও নেই। যাঁরা দুর্গাকে গঙ্গায় নিয়ে যেতেন? মশালের লালচে আলোয় যাঁদের ঘর্মাক্ত চেহারা দেখে রীতিমতো ভয় হত। সে সবের কিছুই নেই এখন। তবে সব যাওয়ার পরেও অবিকল রয়ে গেছে আরাধ্য দেবীর স্নিগ্ধ মায়াময় মুখটি।