দ্য ওয়াল ব্যুরো: মৃত্যুর আতঙ্কে থমথম করছে গোটা দেশটা। আতঙ্কের চেয়েও বেশি কাজ করছে, সংক্রমণের আশঙ্কা। এই বুঝি কোনও না কোনও ফাঁকফোকর দিয়ে স্পর্শ করে ফেলল মারণ করোনাভাইরাস! এই বুঝি সে ভাইরাসের আক্রমণে ছড়িয়ে গেল কোভিড ১৯ অসুখ! দেশের বড় অংশের মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রেখে প্রায় গোটা দেশটাকে লকডাউন করে ফেলেও এড়ানো যাচ্ছে না বিপদ।

এমনই অবস্থায় দিনের পর দিন ঘরবন্দি থাকা মানুষজন শনিবার বিকেলে অপূর্ব এক আবহ তৈরি করলেন বিভিন্ন শহরে। মৃত্যুর আতঙ্ক মুছে জীবনের গান গাইলেন তাঁরা দল বেঁধে। না, পথে নামতে পারেননি কেউ, মঞ্চ গড়তে পারেননি। আদতে বেরোতেই পারেননি ঘর থেকে।

তাতে কী? যেখানে গলার স্বরে জীবনের সুর মুক্ত হতে চায়, সেখানে কোনও বাধাই কি বাধা? তাই শনিবার বিকেলে স্বতঃস্ফূর্ত এক আহ্বানে সকলে বেরিয়ে এলেন নিজের নিজের বাড়ির বারান্দায়। কেউ উঠলেন ছাদে। কারও সঙ্গী হারমোনিকা, কারও আবার স্যাক্সোফোন। কারও রয়েছে খালি গলার উদাত্ত স্বর। কারও বয়স হয়েছে বেশ, কেউ নেহাৎই কিশোর। সবাই মিলে গেয়ে উঠলেন খোলা গলার গান। একসঙ্গে গলা মেলালেন ভয় জয় করা জীবনমুখী সুরে।

ডিসেম্বরের শেষদিকে চিনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি এখন গোটা ইউরোপ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সবচেয়ে সঙ্কটাপন্ন অবস্থা ইতালির। এরই মধ্যে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় দেড় হাজারে।

চিনের বাইরে আর কোনও দেশে এখন পর্যন্ত এত আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ফেব্রুয়ারিতে ইতালির উত্তরাঞ্চলে করোনাভাইরাসের আবির্ভাবের পরেই সংক্রমণ রুখতে একের পর এক পদক্ষেপ করেছে সরকার। জনসমাগম ও ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁর পাশাপাশি বেশিরভাগ দোকানও বন্ধ রাখা হয়েছে। গৃহবন্দি করা হয়েছে প্রায় দেড় কোটি মানুষকে।

এমনই এক দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে শনিবার বিকেলে ইতালির বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা নিজেদের বারান্দায় ও ছাদে দাঁড়িয়ে গলা মিলিয়ে গান ধরেন মুক্তকণ্ঠে। ইতালীয় শিল্পী আদ্রিয়ানো কালেন্তানের ‘আজুরো’ গানের সুরে মুখরিত হয় অসুখ-বিধ্বস্ত নগরীর আনাচ কানাচ। গানের তালে, সুরের মূর্চ্ছনায় করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেদের ঊজ্জীবিত করেন তাঁরা।

কারও কারও জানালা ও ব্যালকনিতে ঝোলানো হয় ব্যানার, যাতে লেখা-- ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। শুধু তাই নয়, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের উদ্দেশে সমবেত হাততালি দিয়ে সম্মানও জানান তাঁরা।

সম্প্রতি এমনই একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শহররে গলির দু’ধারে অজস্র ফ্ল্যাটবাড়ি। রাস্তার দিকে সব ব্যালকনি। আর সেখানে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকে মেতেছেন গানে, আনন্দে। একে অপরের সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলছেন তাঁরা, সাহস জোগাচ্ছেন পরস্পরকে। সঙ্গে উচ্চস্বরে গাইছেন স্থানীয় ভাষায় গান।
দেখুন ভিডিও।
https://www.youtube.com/watch?v=DDRiINXik00
গানের সুরে তাল মিলিয়ে কোমর দোলাচ্ছেন ছোট, বড়, মহিলা, পুরুষ সকলে।

এই গোটা কর্মকাণ্ডটাই ঘটছে পরস্পরের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে। কোয়ারেন্টাইনে থেকেও, অসুখের আশঙ্কায় একটা করে দিন পার করেও এই যে মনের জোর, আনন্দ করার ইচ্ছে, এটাই যেন জারি রেখেছে মৃত্যুপুরী ইটালির স্পন্দন। এভাবেই মানুষ 'উপভোগ' করছেন বন্দিদশা। অনেকেই বলছেন, এই প্রাণস্ফূর্তি দিয়েই রুখে দেওয়া যাবে করোনা-আতঙ্ক।
