
শেষ আপডেট: 5 March 2023 07:50
দৃশ্যটা অনেকেরই নজর কেড়েছে। খোলা মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনবার ঝুঁকে প্রণাম করলেন প্রবীণকে। বারে বারে বললেন, ‘উনি দলের সম্পদ, রাজ্যের গর্ব।’
যাঁর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী সেদিন একটা উচ্ছ্বসিত, বছর পেরোয়নি, সেই বুকানাকেরে সিদ্দালিঙ্গাপ্পা ইয়েদুরাপ্পাকে রাজনীতিতে একপ্রকার ‘বাতিল’ ঘোষণা করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা। কর্নাটকের (Karnataka) সেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পার আশিতম জন্মদিনের দিনটিই প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছিলেন কর্নাটকের শিবমোগ্গা বিমানবন্দর উদ্ধোধনের জন্য। ২৭ ফেব্রুয়ারি সরকারি অনুষ্ঠান মঞ্চটি হয়ে উঠেছিল প্রবীণ নেতার সংবর্ধনা সভায়। আর দর্শকাসন থেকে বারে বারে স্লোগান উঠেছে ‘গেল্লালু বিএসওয়াই’। মোদীর উপস্থিতিতে কোনও নেতার সভায় দ্বিতীয় কোনও নেতার নামে টানা স্লোগান একপ্রকার বিরল ঘটনা। ‘বিএসওয়াই’-সংক্ষিপ্ত নামেই কন্নড় ভূমিতে বেশি পরিচিত ইয়েদুরাপ্পা। কন্নড় ভাষায় গেল্লালু মানে হল ‘জয় হো’।
সেই অনুষ্ঠানের নজির টেনে শুক্র ও শনিবার কর্নাটকে নির্বাচনী জনসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, সব দলের শেখা উচিত কীভাবে একজন প্রবীণ নেতাকে সম্মান জানাতে হয়। শাহের ভাষণেও ছিল ইয়েদুরাপ্পার ভূয়সী প্রশংসা। বলেছেন, বিজেপিতে ওঁর মতো অবদান কম নেতার আছে।
হালে রাজনাথ সিং, জেপি নাড্ডা থেকে শুরু করে কর্নাটকে বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতাদের ভাষণে থেকে থেকে আসছে বিএসওয়াইয়ের কথা। কারণ স্পষ্ট, দক্ষিণ ভারতের এই একটি রাজ্যেই বিজেপি এখনও পর্যন্ত ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। আর তা সম্ভব হয়েছে এই প্রবীণের হাত ধরেই।
চারবারের মুখ্যমন্ত্রী, দু’বারের বিরোধী দলনেতা সেই বিএসওয়াইকে আচমকাই রাজনৈতিক সন্ন্যাসে পাঠিয়ে দেন মোদী-শাহরা। মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসিয়ে দেন বাসবরাজ বোম্মাইকে। তাহলে সেই ‘বাতিল’ বিএসওয়াই-কে এক খাতির-যত্ন করার কারণ?

আসলে মুখ্যমন্ত্রী বদলের পর বছর ঘোরার আগেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বুঝতে পারে, কাজটা ঠিক হয়নি এবং বড্ড তাড়াহুড়ো করা হয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর পরই ভোটের রাজনীতি থেকে ইয়েদুরাপ্পার অবসর ঘোষণা অভিমানী ইয়েদুরাপ্পা। সেই সঙ্গে তাঁর অনুগামী বিধায়কদের বিদ্রোহে বিজেপি বুঝতে পারে, একা বিএসওয়াই সব অঙ্ক পাল্টে দিতে পারেন।
কালক্ষেপ না করে কর্নাটকের এই প্রবীণ নেতাকে দলের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য করে নিয়েছেন মোদী। দলের নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকারী হল ওই কমিটির। বিএসওয়াইকে সেই কমিটিতে নিয়ে মোদী আসলে কর্নাটকে দলকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার দায়িত্বটা কৌশলে এই প্রবীণ নেতার উপর চাপিয়ে রেখেছেন। পাশাপাশি সুযোগ পেলেই পাঁচজনকে দেখিয়ে মোদী একান্তে কথা বলছেন প্রবীণ নেতার সঙ্গে। বিজেপির অন্দরমহলের ব্যাখ্যা, প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চাইছেন, মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও দলে বিএসওয়াইয়ের গুরুত্ব কমেনি।
তারপরও মোদী-শাহরা নিশ্চিত নন। বিজেপি বুঝতে পেরেছে, বাকি সব রাজ্যে মোদীকে মুখ করে ভোট বৈতরণী পেরনো গেলেও কর্নাটকে অশীতিপর ইয়েদুরাপ্পাকে ছাড়া কংগ্রেসকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বাসবরাজকে মুখ্যমন্ত্রী করার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে বিরক্ত দল। আবার ভোটের মুখে তাঁকে সরানোও কঠিন।
কর্নাটকে মোদী-শাহদের তাই কৌশল হল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে প্রচারের সামনের সারিতে এনে বার্তা দেওয়া রাজ্যের এই নেতার কথাতেই এখন থেকে দল এবং সরকার চলবে। সেই বার্তা জোরদার করতে বিজেপির সভামঞ্চ কার্যত বিএসওয়াইয়ের পূজার্চণায় পর্যবসিত হচ্ছে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নামে একাধিক সরকারি প্রকল্পের নামকরণ করা হয়েছে ইতিমধ্যে। দলে তাঁর বিধায়ক-পুত্র ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবেন, প্রবীণ নেতাকে কথা দিয়েছেন মোদী-শাহরা। কারণ, কন্নড় রাজনীতিতে প্রভাবশালী লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের মুখই শুধু নন, ইয়েদুরাপ্পা বলতে গেলে তাদের কাছে শেষ কথা। অশীতিপর নেতার ঈশারা ছাড়া লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের ১৭ শতাংশ ভোট পদ্মের বাক্সে আসা কঠিন। কর্নাটকে প্রধানমন্ত্রীর সভা তাই ‘মোদী, মোদী’র পাশাপাশি ‘গেল্লালু বিএসওয়াই’ স্লোগানে সরগরম হয়ে উঠছে।