দ্য ওয়াল ব্যুরো: চোখ বাঁধা। হাতও বাঁধা, সম্ভবত পিছমোড়া করে। সেই অবস্থায় চলছে জেরা। কিছু প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন উনি। দৃঢ় স্বরে, আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ ভঙ্গিতে। অথচ সৌজন্যে ঘাটতি নেই একটুও। নিজের নাম, পরিচয়ের পরে গড়গড় করে বলে দিলেন সার্ভিস নম্বরও। অথচ কিছু প্রশ্নের উত্তরে আবার সটান বলে দিচ্ছেন, ‘সরি, আর কিছু বলতে পারব না।’
এত সাহস! এত তেজ! এত মনোবল! এই বিস্ময়ই নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশবাসীকে। ভিতর থেকে। যুদ্ধ নিয়ে হাজার তর্ক-বিতর্ক, মত-দ্বিমতের ভিতরে আজ একটাই আগুনের শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছেন, এই মানুষটি। সে আগুনের নাম অভিনন্দন!
বুধবার প্রত্যাঘাত চলাকালীন ভারতীয় যুদ্ধবিমান মিগ ২১ ধ্বংস করার পরে বায়ুসেনার উইং কম্যান্ডার অভিনন্দন বর্তমানকে গ্রেফতার পরে পাক বায়ুসেনার তরফে কিছু ভিডিও পোস্ট করার পরে, বুধবার এভাবেই দফায় দফায় চড়েছে সাধারণ মানুষের বিস্ময়ের পারা।
আর মানুষ বিস্মিত হবে না-ই বা কেন! কিছু ক্ষণ আগেই তো এই জেরা পর্বের ঠিক আগের দৃশ্যের ভিডিও দেখেছে তারা। মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছেন উইং কম্যান্ডার। এ পড়াও অবশ্য নিছক পড়ে যাওয়া ছিল না। যুদ্ধবিমান ক্র্যাশ করার মুহূর্তে সিট থেকে 'ইজেক্ট' করে প্যারাশ্যুট নিয়ে মাটিতে ছিটকে পড়া। জল-কাদার মধ্যে। সেই পড়ে যাওয়া অবস্থা থেকে তাঁকে তোলা হচ্ছে মারতে মারতে। ঠিক বেধড়ক মার বলা যায় না, এক রকমের হেয় করার মার। অপমান মেশানো মার। সপাটে।
https://twitter.com/MadihaAbidAli/status/1100720368283717632
উন্মত্ত পাক জনতার সেই মারের সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। মারতে মারতেই নিয়ে যাচ্ছে তারাও। এক সময়ে মানুষটার চোখ–মুখ ফেটে বেরোচ্ছে রক্ত। দেখে আপনাআপনিই সারা দেশ শিউরে উঠছে, মুখে মুখে অস্ফূটে বেরিয়ে আসছে, ইসসস...কী হবে এবার! কী হবে বা কী হয়েছে, জানা গিয়েছে কিছু পরেই। দ্বিতীয় ভিডিওয় এ কথা-সে কথার পরে, চোখ বাঁধা অবস্থাতেই মানুষটি প্রশ্ন করেছেন, "স্যার, আমি কি জানতে পারি, আমি পাকিস্তান আর্মির হেফাজতে রয়েছি কি না?"-- এই চরম বিপদে পড়েও এতটা সৌজন্য! এতটা কমনীয়তা! এতটা ধৈর্য্য!
সারা দেশের মানুষের বুকের ভিতর থেকে আপনাআপনি ছিটকে এসেছে একটাই শব্দ। অভিনন্দন!
হ্যাঁ, বুধবার দুপুর থেকে দেশবাসীর মনে মিশে যাওয়া ভয়, বিস্ময়, গর্ব, শ্রদ্ধার মিশেল হয়ে আজ বারবার প্রকাশিত হয়েছে এই অভিব্যক্তিটিই-- অভিনন্দন!
এর পরেও এসেছে তৃতীয় ভিডিও। পাক সেনার হাতে বন্দি হওয়া ভারতীয় বায়ুসেনা অভিনন্দন বর্তমানের মুখের রক্ত মোছা হয়েছে। চোখেমুখে যদিও স্পষ্ট কালশিটে পড়া রয়েছে। চায়ের কাপ হাতে সেই মানুষটিই বলছেন, "আমি পাকিস্তানি সেনার ব্যবহারে মুগ্ধ। বিশেষত যে অফিসার আমাকে জনতার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন এবং অন্য যে সৈন্যরা আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেছেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ।" চমকের আরও বাকি। শত্রু দেশের সেনা শিবিরে বন্দি মানুষটি কৃতজ্ঞতা পর্ব সেরে মনে করিয়ে দিলেন, দেশে ফিরেও এই মুগ্ধতার মনোভাব তিনি বদলাবেন না। বলতে ভুললেন না, চা-টা দিব্য খেতে হয়েছে! সেই সঙ্গে আরও কিছু প্রশ্নে সটান জানিয়ে দিলেন, "এটা তো আমার আপনাকে বলার কথা নয়।" একটুও কাঁপল না গলা, এক বারের জন্যও ভয় বা দ্বিধা এসে আড়াল করল না আত্মবিশ্বাস।
https://www.youtube.com/watch?v=NUdS-0nZvWI
এর পরেও, এমন চূড়ান্ত স্থিরতা, দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্ব উপলব্ধি করার পরেও মানুষ বলে উঠবেন না, অভিনন্দন!
বলে উঠেছেন। যে মানুষ এই ক'দিনে দেশপ্রেমের চড়া নেশায় মজে আমআদমির বাড়ি গিয়ে হুঙ্কার দিয়ে থ্রেট করেছেন, দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা হিসেবে জোর করে বন্দেমাতরম বলিয়েছেন তিনিই হোন, যে মানুষ মারের পাল্টা মার দাবিতে চিৎকার করে গলার শিরা ফুলিয়েছেন সেই যুদ্ধকামীই হোন, অথবা হোন না কেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে মৃত্যুর বিরুদ্ধে শক্ত করে হাত মুঠো করে রাখা কোনও শান্তিকামী মানুষটি-- বুধবার বিকেলের ঘটনা তাঁদেরকেও একযোগে বলিয়ে দিয়েছে, অভিনন্দন! সোশ্যাল মিডিয়া অন্তত তেমনটাই বলছে।
বুধবার বিকেলে পাক সেনার প্রকাশ করা ভিডিওয় গ্রেফতার হওয়া ভারতীয় বায়ুসেনা অভিনন্দকে দেখার পরে এমন করেই 'অভিনন্দন' ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, হাজার বিরোধিতার মধ্যেও, আজ সবার উপরে অভিনন্দনই সত্য। সত্য তাঁর শৌর্য, সৌজন্য, স্বাভিমান, সাহস।
এত দিন ধরে জমে ওঠা অসংখ্য ঠিক-ভুল, হাজার হাজার দেশপ্রেমের সংজ্ঞা, লক্ষ অস্থিরতারকে যেন এক লহমায় দেশের প্রতি সত্যিকারের দায়িত্ববোধের আয়নার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে অভিনন্দনের ওই নির্বিকার মুখ আর নিস্পৃহ স্বরে বলা একটাই কথা— "আই অ্যাম নট সাপোজ়ড টু টেল ইউ।"
না, কোনও সেনার এই পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বড় একটা পরিচয় হয়নি এত দিন।
সাধারণ মানুষ সেনার পেশাদারী দেখেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। দেখেছে বিপর্যয় মোকাবিলায়। দেখেছে সীমান্তের ঠায় নির্ঘুম প্রহরায়। কিন্তু শত্রুপক্ষের শিবিরে নিজের দেশের এক সেনাকে এমন গর্বিত মুহূর্ত তৈরি করতে দেখার সৌভাগ্য হয়নি সাধারণ মানুষের। তাই স্বাভাবিক ভাবেই বিস্ময়ের প্রাথমিক পর্ব পার করে তাঁরা আবেগে আপ্লুত। গর্বে উচ্চকিত। অনুপ্রেরণায় উদ্বেল! কুর্নিশে আনত।
অস্ত্রে নয়, মারে নয়, শক্তিতে নয়। শুধু পেশাদারিত্বে আর আত্মবিশ্বাসে যে কেমন করে মন জয় করে নেওয়া যায়, তা যেন আজ দেশবাসীকে শিখিয়ে দিলেন অভিনন্দন। তাঁর বীরত্বের নিদর্শন তাই সারা দেশবাসীকে দিয়ে আজ একটাই কথা বলিয়ে নিয়েছে।
অভিনন্দন!