দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে নাকি ছত্রিশ ঘা। পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের ভয় ও আতঙ্ক এতটাই বেশি, যে তা প্রবাদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ এক অন্য পুলিশের কাহিনি। যে পুলিশের স্পর্শে সারছে অসুখ। কারণ খাকি পোশাক পরে প্রশাসন সামলানোর দায়িত্বে আসীন হলেও, আদতে তিনি একজন চিকিৎসকও। তাই এই করোনা সংকটের সময়ে লাঠি হাতে মানুষকে শাসন করার সঙ্গে সঙ্গেই, স্টেথো হাতে চিকিৎসাও করছেন প্রয়োজনে।
অসমের তরুণ আইপিএস অফিসার, বরপেটার পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট রবীন কুমার কোভিড যোদ্ধা হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে পালন করছেন দ্বৈত ভূমিকা। তাঁর এই কীর্তির কথা সামনে আসতেই শ্রদ্ধায় আনতশির নেট-দুনিয়া।
২০১৩ ব্যাচের আইপিএস অফিসার রবীন এমবিবিএস এবং এমডি করছেন তার আগে। তার পরে পেশা হিসেবে চিকিৎসার পথে না হেঁটে, প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। ফলে এমনিতেও নানা সময়েই এমার্জেন্সি পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এবার সময়ের দাবিতেই নিজের পুরনো পেশাকে কাজে লাগাচ্ছেন পুরোদমে।
বরপেটা পুলিশ রিজার্ভে তিনি একটি ৫০ শয্যার কোভিড কেয়ার সেন্টার গড়ে তুলেছেন। চারটি আইসিইউ বেড আছে তাতে। মূলত পুলিশকর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এখানে চিকিৎসা পাচ্ছেন। পাশাপাশি, মহিলা ও বৃদ্ধদের জন্য স্বাস্থ্যশিবিরও করছেন রবীন কুমার।
সংবাদমাধ্যমকে রবীন জানিয়েছেন, "আমি যে এই কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি, সে জন্য আমার নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়। আমি জেলার পুলিশ প্রধান এবং চিকিৎসক-- দুই ভূমিকাই পালন করছি। এটা আমার খুবই ভাললাগার ও তৃপ্তির একটা জায়গা।"
https://twitter.com/Barpeta_Police/status/1300742328009674753
এসপি রবীন কুমার আদতে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ জেলার বাসিন্দা। আইপিএস উত্তীর্ণ হওয়ার পরে অসম পুলিশে যোগ দেন তিনি। কয়েক বছর আগে তেজপুরে পোস্টেড থাকার সময়ে সেখানে একটি স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করেছিলেন রবীন। এবার মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আরও বেশি করে মানুষের সেবা করতে হবে। চিকিৎসক হিসেবে আরও লড়তে হবে তাঁকে।
তিনি বলেন, "যখন মহামারী ছড়িয়ে পড়ল, আমি অসমের ডিজিপি ভাস্কর জ্যোতি মোহান্তর কাছে অনুমতি নিই, বরপেটার পুলিশকর্মীদের কোভিড চিকিৎসকার জন্য একটি কেন্দ্র খুলতে পারি কিনা। উনি অনুমতি দেন, তার পরে খুব ভাল ভাবে চলছে কোভিড কেয়ার সেন্টার। এখানে চারটি আইসিইউ, ৩২টি জেনারেল বেড এবং ১৪টি কোভিড পরবর্তী কেয়ারের শয্যা রয়েছে।"
অসমের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল রবীন কুমারের এই কাজের বিশেষ প্রশংসা করছেন। তিনি বলেছেন, "উনি মানবতার সেবা করছেন। আক্ষরিক অর্থেই যোদ্ধার মতো লড়ছেন।"
রবীন কুমারের সহকর্মীরাও বন্ধুর এই দ্বৈত ভূমিকায় খুব খুশি। পুলিশের ইউনিফর্ম পরে তিনি চিকিৎসা করছেন, এ ছবি ইতিমধ্যেই ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে। শুধু অসম পুলিশ নয়, সারা দেশের পুলিশ শ্রেণির কাছেই রবীন কুমার একটি গর্ব। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এডিজি রেণুকা মিশ্র টুইটও করেছেন রবীনকে উৎসাহ দিয়ে।
https://twitter.com/renukamishra67/status/1301112068796342283
মীরাটের লালা লাজপত রাই মেমোরিয়ার মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেছেন এসপি রবীন কুমার। কিন্তু পুলিশ হয়ে যাওয়ার পরেও সাধারণ মানুষের সেবা করার এতটা সুযোগ পাবেন, তা কখনও ভাবেননি রবীন। এখনও পর্যন্ত কম করে ৭৬ জন পুলিশকর্মী চিকিৎসা পেয়েছে রবীন কুমারের কোভিড কেয়ার সেন্টারে। রবীন নিজে চিকিৎসা করেছেন প্রত্যেকের। প্রত্যেকেই সেরে উঠে কাজে যোগ দিয়েছেন ফের।
শুধু তাই নয়, জেলার পুলিশকর্মীদের মধ্যে যাঁদের হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো সমস্যা রয়েছে তাঁদের যাতে বাইরে ঘুরে কাজ করতে গিয়ে ভাইরাসের ঝুঁকি না বাড়ে, তাই তাঁদের ডেস্কে বসে কাজ করারও ব্যবস্থা করেছেন পুলিশ সুপার রবীন কুমার।
এ সবের পাশাপাশি, বরপেটা পুলিশের তরফে একটি কমিউনিটি কিচেনও চালাচ্ছেন তিনি। লকডাউনের মধ্যে চল্লিশ দিন ধরে সেখানে পেট ভরে খাচ্ছেন গরিব-দুঃখী মানুষরা।
কিন্তু অনেকেরই প্রশ্ন, চিকিৎসক হওয়ার যখন এতই ইচ্ছে ছিল, এতই ভালবাসেন মানুষের সেবা করতে, তখন ডাক্তারি না করে তিনি সিভিল সার্ভিসে যোগ দিলেন কেন? রবীন কুমার জানিয়েছেন, তিনি চিকিৎসক হওয়ার পরে, ২০১১ সালে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হন। দিল্লির জিবিটি হাসপাতালে ছিলেন তখন তিনি। সে সময়ে চারপাশের পরিস্থিতি দেখে তাঁর মনে হয়, প্রশাসনিক ভাবে সরকারি নীতি প্রণয়ন করা খুব জরুরি।
"চিকিৎসক হিসেবে লড়াই একরকম। কিন্তু অসুখ যাতে না হয়, তার জন্য করণীয় কী? আমি সেই বিষয়েই প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিলাম। তাই আইপিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসনিক কাজে আসার কথা ভাবি।"-- বলেন রবীন।