
শেষ আপডেট: 27 January 2024 18:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গ্রামটা কবে থেকে ভূতুড়ে হয়েছে তা কেউ বলতে পারে না। কেউ গ্রামে মানুষ থাকে না, সে কার্য-কারণও কেউ খুঁজতে যায়নি। একটা অজানা ভয় সকলের ভেতরেই কাজ করে। রাজস্থানের কুলধারার নাম শুনলেই যেমন বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে মরুশহরের বাসিন্দাদের, ঠিক তেমনই আসানসোলের প্রত্যন্ত বেনাগ্রামকে নিয়েও কোন এক অজানা রহস্য বাসা বেঁধেছে। গোটা গ্রাম জনমানবহীন। রাস্তাঘাট শুনশান। সন্ধে নামলে কেউ বেনাগ্রামের ত্রিসীমানায় পা রাখার কথা ভাবে না। এক আধবার রাস্তা ভুলে গ্রামে ঢুকে পড়েছিলেন যাঁরা, তাঁরা বলেন, “কেমন একটা গা ছমছমে ভাব। নিস্তব্ধ গ্রামে কারা যেন ফিসফিস করে কথা কয়। গায়ে কাঁটা দেয়।”
একটা সময় এখানে সব ছিল। মানুষজনের বসবাস ছিল। ঘরে ঘরে আলো ছিল। উৎসবের আমেজ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন বদলে গিয়েছে ছবিটা। রাতারাতি অন্ধকার গ্রাস করেছে আস্ত একটা গ্রামকে। ২০ বছর আগেও যে গ্রামের প্রাণ ছিল, সেই গ্রামটাই আঁধারে ডুবে গেছে। গ্রামকে ঘিরে ভূত-প্রেতের নানা কাহিনি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে। কুলটি বিধানসভার বেনাগ্রামের এমনই ভয়াবহ অবস্থা। গোটা গ্রাম গত দুই দশক ধরে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢেকে। বছরের শুধুমাত্র একটি বিশেষ দিনেই আলো জ্বলে গ্রামে। সে দিনটা হল লক্ষ্মীপুজোর দিন। কোজাগরী পূর্ণিমায় প্রদীপ জ্বেলে মায়ের পুজো করে একটা রাত গ্রামে কাটান পুরনো বাসিন্দারা। ভোর হতেই আবার গ্রাম ফাঁকা। আরও একটা বছরের জন্য বেনাগ্রাম ভূতুড়ে তকমা নিয়ে বেঁচে থাকে।
লক্ষ্মীপুজোর মণ্ডপ
আসানসোলের নিয়ামতপুর থেকে একটি রাস্তা চলে গিয়েছে বেনাগ্রামের দিকে। সুন্দর গাছপালা দিয়ে ঘেরা গ্রাম। গ্রামে ঢুকতেই রয়েছে লক্ষ্মী মন্দির। রাস্তার দুপাশে পাকা বাড়ি, উঠোন। একটা সময়ে মানুষের বাস ছিল দিব্যি বোঝা যায়। এখন বাড়িগুলো ভগ্নপ্রায়। দীর্ঘসময় ধরে বসতি না থাকার কারণে গোটা গ্রামটা যেন জঙ্গলের চেহারা নিচ্ছে। বাড়িগুলোকে ঘিরে ঝোপঝাড়, কাঁটাগাছ হয়েছে। গ্রামের শেষপ্রান্তে একটি কালী মন্দির আছে। তার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে আসানসোল-ধানবাদগামী রেললাইন।
গ্রাম ছাড়ার হিড়িক কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা আর মনে নেই অনেকেরই। তবে ২০০৫ সাল নাগাদ গ্রামটা শ্মশানে পরিণত হয়। গ্রামেরই এক প্রবীণ বাসিন্দা বলছেন, কারও কাঁচা বাড়ি নয়। সম্পন্ন গৃহস্থেরা থাকতেন। পাকা বাড়ি, উঠোন, জমিজায়গা সব ছেড়ে সকলে চলে যান। রাতারাতি গুজব ছড়িয়ে যায় ভূতের ভয়ে নাকি গ্রামছাড়া হয়েছে বেনাগ্রামের মানুষজন।
কিন্তু গ্রাম ছাড়ার আসল কারণটা কী? ভূত বলে মানতে রাজি নন গ্রামের আদি বাসিন্দাদের কয়েকজন। তাঁরা বলছেন, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পরিবহন কিছুই ঠিকমতো ছিল না বেনাগ্রামে। পানীয় জলের অভাব ছিল। গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়নি। স্কুল-কলেজের জন্য অনেক দূরে যেতে হত। একটা সময়ে গ্রামে অপরাধমূলক কাজকর্মও বাড়ছিল বলে দাবি। খুন করে দেহ রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যাওয়ার ঘটনাও নাকি ঘটে কয়েকবার। আতঙ্ক, নিরাত্তার অভাব ও অনুন্নয়নের জন্যই গ্রামের লোকজন ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে থাকেন বলে দাবি কয়েকজনের।
তবে বেনাগ্রামকে ঘিরে পর্যটনের ভাবনা শুরু করেছে আসানসোল পুরসভা। কুলটি শহরের সঙ্গে গ্রামকে জুড়তে প্রায় দু’কিলোমিটার ঢালাই রাস্তা, পানীয় জলের পাইপ লাইন, বিদ্যুতের খুঁটি পোঁতা, পুকুরের সংস্কার-সহ বেশ কিছু কাজ শুরু হয়েছে। উন্নয়নের ছোঁয়া লাগার সঙ্গে সঙ্গে লাগোয়া এলাকায় জমি বিক্রিও শুরু হয়ে গিয়েছে। আসানসোল পুর কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়েছিলেন, গ্রামের বাসিন্দারা চলে গেলেও মায়া কাটাতে পারেননি। তাই প্রতি বছর একদিনের জন্যও ফিরে আসেন। গ্রামবাসীদের আবেগ দেখেই বেনাগ্রামকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু হয়েছে। গ্রাম বাসযোগ্য হয়ে উঠলে, রাস্তায় রাস্তায় আলো জ্বললেই ভূতের ভয় ঘুচবে। পুরনো ভিটেমাটিতে আবার ফিরে আসবেন বাসিন্দারা।