দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারা বিশ্বে ম্যারাথন দৌড়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়ে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত বছর চিনে আয়োজিত 'ইন্টারন্যাশনাল অ্যামেচার অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের গ্লোবাল রানিং কনফারেন্স'-এ প্রথমবার চোখে পরে এই দৃশ্য। 'রানরিপিটডটকম'-এর এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালে দৌড়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫০.২৪ শতাংশ মেয়ে ছিল। ভারতেও দেখা যাচ্ছে এক দৃশ্য। অনেকেই মনে করছেন এমনটা লিঙ্গবৈষম্য দূর করার দিকে ইঙ্গিত করছে।
এবছর প্যানডেমিকের সময় ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হল লন্ডন ম্যারাথন দৌড়। সেখানে অংশগ্রহণকারী, ৫২ বছরের ক্রান্তি সালভি জানান, ম্যারাথন দৌড়ে তিনি তাঁর স্বামীকে পিছনে ফেলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। কিন্তু আমি আমার স্বামীর থেকে বহুগুণ দ্রুত দৌড়েছি।"

ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় রোড রেস, মুম্বাই ম্যারাথনের প্রোমোটর, বিবেক মিশ্র জানান, "এত মেয়েকে একসঙ্গে দৌড়াতে দেখে আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছিল। অবাক হয়ে গিয়েছিলাম দেখে। ২০০৪ সালে ম্যারাথনের পুরো দৌড়ে যখন ঠিকমতো অনেকেই যোগদান করছিল না, তখন দিল্লিতে ম্যারাথনের অর্ধেক দৌড়ে প্রতি ২৫ জনের মধ্যে ২০ জন মেয়ে যোগ দিয়েছিল। এমনকি শেষ বেঙ্গালুরুর ম্যারাথনে মেয়েরাই ছিলেন অর্ধেকের বেশি।"
প্রোক্যামের তথ্য অনুসারে, ২০০৪ সালের মুম্বাই ম্যারাথনের উদ্বোধনেই পুরো দৌড়ে ৮৮ জন মেয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এক দশকে সংখ্যা বেড়ে দশগুণ হয়েছে। এই বছর জানুয়ারিতে সেই সংখ্যা হয়েছে ৮৫২ জন। ২০১৮ সালে ৫৭৮ জন থেকে এই বছর জানুয়ারিতে বেড়ে হয়েছে ৩৯০৯ জন।

অন্যদিকে অর্ধেক ম্যারাথনে ২০০৪ সালে ৪২০ জন থেকে সংখ্যা বেড়ে এই বছরে দাঁড়িয়েছে ২৭৯৬ জন। দিল্লির অর্ধেক ম্যারাথনে এর সংখ্যা বেড়েছে ছয়গুণ। ২০১৭ সালের দৌড়ে ৩০৬ জন মেয়ে থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ২০৭৯ জন হয়েছে। তারা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণের হার ১০শতাংশ বেড়েছে।
৩৯ বছরের রোশনি রাই, কালিম্পংয়ের এক সাধারণ মেয়ে থেকে এখন একজন সফল ম্যারাথন দৌড়ের কোচ। তিনি জানান ২০১২ সালে মুম্বাই ম্যরাথনে প্রতি ২০ জনের মধ্যে ৫ জন মেয়ে ছিল। পরে ২০১৯ সালের দৌড়ে অর্ধেক সংখ্যক মেয়ে যোগ দিয়েছিল। আর এখন কালিম্পংয়ে প্রতি ১৫ জনের মধ্যে ১০ জন মেয়ে ম্যারাথনারকে পাওয়া যায়। দৌড়ে মেয়েদের এভাবে এগিয়ে আসায় তিনি খুবই খুশি। রাই বলেন "মেয়েরা ছেলেদের থেকে পিছিয়ে-- সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ফাটল ধরছে এর ফলে।"

রোশনি রাই জানান, আগে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শুধুমাত্র উডউইন্ড ব্যান্ডস আর মার্চ-পাস্ট ড্রিলস হত। আর এখন গ্রামে গ্রামে ম্যারাথন দৌড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৫ হাজার, ১০হাজারের দৌড়ে অনেক বেশি সংখ্যক মেয়েদের দেখা যায়। পুরস্কার হিসেবে ১০ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। এই অর্থ পুরস্কার আসলে তাদের পরিবারের কাজেই লাগে। এই পুরস্কারের কথা ভেবেই অধিকাংশ মেয়েরা যোগদান করেন। গরিব, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করেন এই ভাবে।
সমীক্ষায় জানা গেছে, অনেক মেয়ে নিজেদের জীবনযাত্রা, সুস্থতার কথা ভেবেও অংশগ্রহণ করছেন ম্যারাথন দৌড়ে। মধ্যবয়সী মেয়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে ধীরে ধীরে। যেহেতু নন-টেকনিকাল স্পোর্টস, তাই নিজের মতো করে এই দৌড়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যায়। পরিবার, সন্তান, কাজের বাইরে মেয়েরা কিছুটা সময় নিজেদের দিতে চান এখন। ফলে এতে তারা নিজেদের মত সময় কাটাতে পারে। ফিট থাকার কথা ভেবেও অনেকে যোগ দিচ্ছেন।

সারা পৃথিবীর নানা দেশে মেয়েদের এই হারে অংশগ্রহণ করতে দেখে খুশি হয়েছেন ম্যারাথন দৌড়ের উদ্যোক্তারা। আইসল্যান্ডে ৫৯ শতাংশ মেয়ে অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, কানাডায় ৫১ শতাংশ মেয়ে দেখা যায় দৌড়ে। দৌড়ে যেখানে সাধারণত ছেলেদের দেখা যেত, সেখানে মেয়েদের সংখ্যা বাড়ায় সমাজের তথাকথিত ভাবধারাকে তো ভাঙছেই, একইসঙ্গে লিঙ্গ বৈষম্যের হার যে কমছে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।