দ্য ওয়াল ব্যুরো: অরণ্যতেশ গাঙ্গুলি, নামটা এখন আর শুধু শ্রীরামপুর, হুগলিতে আটকে নেই। মস্কোতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড চিল্ড্রেনস উইনার গেমস ২০১৯-এ টেবিল টেনিসে সোনা জিতে নিয়েছে সে। এখানেই শেষ হতে পারত তার গল্পটা। কিন্তু এটাই তার শুরু হয় তো। কারণ ছোট্ট অরণ্যতেশ এই ৮ বছরে আরও একটা কঠিন যুদ্ধও জয় করে ফেলেছে। সেই যুদ্ধটার নাম ক্যানসার!
জুলাইয়ের ৪ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতা হয়েছে মস্কোতে। আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মে ট্র্যাক, দাবা, টেবল টেনিস, সাঁতার এবং রাইফেল শুটিংয়ে প্রতিযোগীদের লড়াই করতে হয়েছে। ভারত থেকে মোট ১০ জন প্রতিযোগী ছিল এই প্রতিযোগিতায়। সকলেরই বয়স ৬-১৪ এর মধ্যে। সারা বিশ্ব থেকে বহু প্রতিযোগীই এই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে লড়াই করেছে নিজেদের দক্ষতায়।
এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ‘পোদারি ঝিজ়ন’ নামক একটি সংস্থা। এই ‘পোদারি ঝিজ়ন’ শব্দের অর্থই হল ‘গ্রান্ট অফ লাইফ’ বা ‘জীবনের জন্য’। এই সংস্থাটি চালান দুজন রুশ অভিনেতা। এই সংস্থার উদ্দেশ্য, যে শিশুরা ক্যানসারের সাথে লড়াই করছে, তাদের এসব প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে জীবনমুখী করে রাখা। ভারত থেকে যে ১০ জন ক্যানসার আক্রান্ত শিশু এবার মস্কোয় গেছিল, তাদের সকলকেই মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতাল থেকে বেছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
২০১৬-র এপ্রিলে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিল অরণ্যতেশ। দীর্ঘ লড়াই করে সে মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে। ১১ মাস তার চিকিৎসা চলেছে। দীর্ঘ ওষুধ-পত্র, কেমোথেরাপির পর ২০১৮-এর ডিসেম্বরে তাকে ক্যানসার-মুক্ত করা সম্ভব হয় সেখানকার ডাক্তারদের পক্ষে। তবে তাকে ধারাবাহিকভাবে অবসার্ভেশনে রাখার কথা বলা হয়। ওই ১১ মাসে বারবার তার খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহের বিষয়টা টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে নজরে আসে সকলেরই। সেখানে ভোর সাড়ে পাঁচটায় সে উঠে পড়ত রোজই, তারপর একে একে ফুটবল, দাবা, টেবল টেনিসে মগ্ন থাকত সে। সন্ধায় রাইফেল শুটিংও করত অরণ্যতেশ। আর এত ধারাবাহিক অভ্যাসেই বোধহয় আজ সে সোনা জয়ী মস্কোর এই প্রতিযোগিতায়। একদিনও সে প্র্যাকটিসে ফাঁকি দেয়নি বলে জানাচ্ছেন তার মা কাবেরী এবং টাটা মেমোরিয়ালের শিশু বিভাগের সঙ্গে যুক্ত এক মনোবিদ অমৃতা ভাটিয়া।
কাবেরী স্বাভাবিকভাবেই মা হিসেবে গর্বিত। তিনি বলছেন, যে পরিমাণ অধ্যবসায় এতটুকু ছেলে রোজ করত, তাতে এটাই স্বাভাবিক ছিল। আর সে মাত্র ৮ বছর বয়সে ক্যানসারকে হারিয়ে দিয়েছে, তাই তার কাছে যে কোনও যুদ্ধই অনেকটা সহজ। কাবেরী জানাচ্ছেন, প্রত্যেকদিন ভদ্রেশ্বরে তাঁর ছেলে যেত পঙ্কজ পোদ্দারের শুটিং অ্যাকাডেমিতে প্র্যাকটিস করতে। পঙ্কজ পোদ্দার বলছেন “অরণ্যতেশ আসলে দেবদূত, এতটুকু বয়সেই ওর যে মানসিকতা, যে ভিতরের শক্তি তাতে ও আরও অনেক দূর যাবে। আমরা চেষ্টা করব, ওকে আরও ট্রেনিং দিয়ে এগিয়ে দিতে। ” পঙ্কজ বাবু বিনা পয়সায় তাকে ট্রেনিং দিয়েছেন এতদিন, এই মস্কোর জয়ের পরে আস্তে আস্তে তাঁরা স্পনসরও খুঁজবেন বলে জানিয়েছেন। পঙ্কজ পোদ্দার ছাড়াও সৌমেন মুখার্জি, যিনি অরণ্যতেশকে টেবল টেনিসে ট্রেনিং দিয়েছেন, শরদ ভেজ, যিনি দাবার শিক্ষক ছিলেন এই যোদ্ধার, কোয়েল নিয়োগীর মতো তার সাঁতারের শিক্ষক—এঁরা প্রত্যেকেই এই ছোট্ট অরণ্যেতেশের অন্তরের যে শক্তি তাকে কুর্ণিশ করছেন। বলছেন, জীবন মানে তো যুদ্ধই। আর সকলেই আমরা যুদ্ধ করি রোজ। কিন্তু ভিতরের শক্তি থাকে না বলেই হয় তো হেরে যাই। যা এক্ষেত্রে কাজ করেনি।