দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেখতে অনেকটা উটের মতো। দক্ষিণ আমেরিকার উঁচু পাহাড়ি এলাকায় এদের দেখা মেলে। সারা শরীর লোমে ঢাকা এই প্রাণীর নাম লামা। এই লামার শরীরেই এমন অ্যান্টিবডির খোঁজ মিলেছে যা সার্স-কভ-২ ভাইরাল প্রোটিন নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারবে বলেই দাবি বিজ্ঞানীদের। লামার শরীরে তৈরি দু’রকমের অ্যান্টিবডি থেকে নতুন কোভিড প্রতিরোধী নতুন অ্যান্টিবডি বানাচ্ছে টেক্সাস ইউনিভার্সিটি।
বুধবার ‘সেল’ মেডিক্যাল জার্নালে এই গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। অস্টিনের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগের গবেষক জেসন ম্যাকলেলান বলেছেন, “লামার শরীরে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে যা সার্স-কভ-২ ভাইরাসকে অকেজো করে দিতে পারবে। এই প্রাণীর রক্তের নমুনা থেকে সেইসব অ্যান্টিবডি বার করে তার থেকে দু’রকমের অ্যান্টিবডি আলাদা করা হয়েছে।” গবেষক বলেছেন, এই দুই অ্যান্টিবডিই ভাইরাল প্রোটিন ভেঙে দিতে পারে। মানুষের শরীরের মধ্যে থাকা ভাইরাল স্ট্রেনগুলোকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের সঙ্গে এই গবেষণায় রয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং বেলজিয়ামের ঘেন্ট ইউনিভার্সিটি।
গবেষক জেসন ম্যাকলেলান
কোভিড প্রতিরোধে ভরসা জাগাচ্ছে লামা ‘উইন্টার’
বেলজিয়ামের পাহাড়ি এলাকার খামারে ১৩০ টি লামা ও আলপাকার মধ্যে উইন্টারকে বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল সেই ২০১৬ সালেই। উইন্টার নামে সেই লামার তখন বয়স ছিল ৯ মাস। টেক্সাস ইউনিভার্সিটিরই গবেষক জেসন ম্যাকলেলানের টিমের সদস্য ড্যানিয়েল র্যাপ বলেছেন, সার্স-কভ-১ ও মার্স ভাইরাসের সময় থেকেই এই জাতীয় আরএনএ ভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। সার্স ভাইরাসের প্রোটিন ল্যাবরেটরিতে বিশেষ উপায় বিশুদ্ধ করে সেটা ছোট্ট লামার শরীরে ইনজেক্ট করা হয়। সার্স ভাইরাসের প্রোটিনের প্রভাবে লামার শরীরে যেসব অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল সেগুলো নিয়েই অ্যানালিসিস শুরু হয়।

একইভাবে মার্স ভাইরাসের প্রোটিনও ইনজেক্ট করা হয় লামার শরীরে। সেক্ষেত্রেও মার্স প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। গবেষক ড্যানিয়েল বলেছেন, সার্স ও মার্স প্রতিরোধী অ্যান্টিবডিগুলিকে আলাদা করে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয়। দেখা যায়, উইন্টারের শরীরে যতরকম অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে তার মধ্যে দু’টি এই নয়া সার্স ভাইরাস অর্থাৎ সার্স-কভ-২ এর ভাইরাল প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

ম্যাকলেলান ও ড্যানিয়েল দু’জনেই বলেছেন, সার্স-কভ-২ ভাইরাস তার স্পাইক প্রোটিনের সাহায্যেই মানুষের দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কোষের ভেতর সরাসরি ঢুকে পড়ছে। এখন এই স্পাইক প্রোটিনকে ভেঙে দিতে পারবে যে অ্যান্টিবডি তারই খোঁজ চলছে বিশ্বজুড়ে। লামা উইন্টারের শরীরে যে দুরকম বিশেষ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে তারা এই স্পাইক প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় কতে পারে। ফলে ভাইরাসের প্রোটিন আর দেহকোষের বাহক প্রোটিনের সঙ্গে জুড়তে পারে না।
ড্যানিয়েল বলেছেন, এই দুই রকম অ্যান্টিবডি নিয়ে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন আছে। এদের থেকেই নতুন রকমের অ্যান্টিবডি তৈরি করা হচ্ছে যা কোভিড সংক্রমণকে পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারবে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকসিয়াস ডিজিজের ভাইরোলজিস্ট কিজ়মেকিয়া এস করবেট ও বার্নে গ্রাহামও রয়েছেন এই গবেষণায়। তাঁরা বলেছেন, লামা উইন্টারকে নিয়ে গবেষণা চলছে। নতুন অ্যান্টিবডির পরীক্ষা শেষ হলে অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে তা প্রয়োগ করে দেখা হবে। পরে মানুষের উপর ট্রায়াল হবে। এই অ্যান্টিবডি সংক্রমণ ঠেকাতে পারে বলেই দাবি বিজ্ঞানীদের।