দ্য ওয়াল ব্যুরো: অসাধ্য সাধন করে ইতিহাস গড়ল চেন্নাইয়ের এক বেসরকারি হাসপাতাল। সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় এই প্রথম একটি অন্যতম জটিল হার্ট প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার 'বার্লিন হার্ট সার্জারি' সফল ভাবে করলেন চিকিৎসকরা। তাও আবার অস্ত্রোপচারটি সফল হল মাত্র ৩ বছরের এক রাশিয়ান শিশুর দেহে। দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত শিশুটিকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়ে নজির গড়লেন তাঁরা।
চেন্নাইয়ের এমজিএম হেল্থকেয়ার নার্সিংহোমের কার্ডিয়াক সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টর ডক্টর কেআর বালকৃষ্ণ জানিয়েছেন, শিশুটি হার্টের সমস্যা নিয়েই জন্মেছিল। হার্টের দু'টি ভেন্ট্রিকেলের অর্থাৎ নিলয়ের পর্দা এতই শক্ত ছিল, যে রক্তচলাচল হতো না। পরিস্থিতি ক্রমে খারাপ হচ্ছিল, অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় ছিল না। ইতিমধ্যেই ওইটুকু শিশু দু'বার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ধকল সহ্য করেছে। বহু বার হাতে করে হার্ট পাম্প করে তাকে বাঁচাতে হয়েছে। এর পরে প্রতিস্থাপন ছাড়া উপায় ছিল না।

তবে এই প্রতিস্থাপন আর পাঁচটা অস্ত্রোপচারের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। চিকিৎসা পরিভাষায় এর নাম, 'বার্লিন হার্ট'। ১৯৮৬ সালে বার্লিনে জার্মান হার্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখান থেকেই এই নামটি এসেছে। এই প্রতিস্থাপনের বিশেষত্ব হল, হার্টের কৃত্রিম পাম্প থেকে শরীরের ভেতরে তার ঢুকিয়ে তা হার্টের সঙ্গে যোগ করা হয়৷ কৃত্রিম পাম্পের মাধ্যমে রক্ত সঞ্চালন হয় হার্টে। সময়ান্তরে ব্যাটারি বদলাতে হয় পাম্পের। রোগী তাঁর শরীরের বাইরে একটি ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন, যাতে এই পাম্পটি থাকে। প্রতিস্থাপনের জন্য সবসময় আসল হার্ট পাওয়া যায় না। সেই সমস্যা মেটাতেই গবেষকরা এই কৃত্রিম পাম্পের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন শুরু করেছিলেন। সেই থেকেই এই বদ্ধতি 'বার্লিন হার্ট' বলে পরিচিত।
চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার ও পদ্ধতি সম্পর্কে সব ঠিক করে ফেললেও, বাধ সেধেছিল করোনা পরিস্থিতি। সারা বিশ্বে পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থমকে গেছে ফলে যে সংস্থা এই কৃত্রিম পাম্প তৈরি করে, তারাও প্রয়োজন মতো পাঠাতে পারছে না সেগুলি। তাই পাম্পটি আনানোর জন্য আরও একটি লড়াই করতে হয় চেন্নাইয়ের হাসপাতালকে। জার্মানি থেকে বহু কাণ্ড করে আনা হয় পাম্প। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় সকলে।

মে মাসের ২৫ তারিখে সাত ঘণ্টা ধরে চলে অস্ত্রোপচার। ওটি-তে ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের তাবড় বিশেষজ্ঞরা। বালকৃষ্ণর কথায়, "পাম্পটা শুধু সংযোগ করাই নয়, তার পরে সেই পাম্প রোগীর হার্টে ঠিকমতো রক্ত সঞ্চালনা করতে পারছে কিনা সেটা নিশ্চিত করা এই অস্ত্রোপচারের চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে এ ছোট বাচ্চার শরীরে এই গোটা বিষয়টি কীভাবে কাজ করবে, তা বুঝতে ও দেখতেই আমরা সকলে উদগ্রীব ছিলাম। সারা বিশ্বের কাছে এটা একটা দৃষ্টান্তমূলক অস্ত্রোপচার ছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচার শেষ হওয়ার পরে আমরা খুবই খুশি। খুব কম সময়ের মধ্যেই সেরে উঠেছে ছেলেটি। সুস্থ হয়েছে, ওজন বেড়েছে তার। দু'মাস পরে আমরা বিষয়টি প্রকাশ্যে আনলাম।"
অস্ত্রোপচারের খরচ ভারতীয় মুদ্রায় ৬০ লক্ষ টাকা। রাশিয়ান সরকারের তরফ থেকে এই টাকা পাঠানো হয়েছে চেন্নাইয়ের হাসপাতালে। শিশুটির মা একজন ইঞ্জিনিয়ার, বাবা ব্যবসায়ী। আপাতত তাঁরা ব্যস্ত ছেলের যত্ন নিতে। এই কারণে আলাদা করে নার্সিংও শিখতে হয়েছে তাঁদের। কারণ প্রশিক্ষণ ছাড়া পোস্ট অপারেশন কেয়ার সমস্যাজনক হতে পারে।