
শেষ আপডেট: 21 August 2020 18:30
প্রাণীবিজ্ঞান বলে উড়ন্ত কাঠবিড়ালিরা (Pteromyini) এক কোটি বছরেরও বেশি পৃথিবীতে টিকে রয়েছে। এদের প্রায় ৫০ রকম প্রজাতি রয়েছে এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকায়। তাদের নানা নাম, নানা ধরন। উত্তর ও উত্তর-পূর্ব এশিয়া, সাইবেরিয়া ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার উড়ন্ত কাঠবিড়ালির রঙে ও বৈশিষ্ট্যে আমেরিকান কাঠবিড়ালিদের থেকে কিছুটা আলাদা। তবে যে দেশের বাসিন্দাই হোক, এরা ঘন জঙ্গলে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। উঁচু গাছে বাসা তৈরি করে। মানুষের সংস্পর্শ এদের বিশেষ পছন্দ নয়।
উড়ন্ত কাঠবিড়ালিরা কিন্তু আর পাঁচটা সাধারণ কাঠবিড়ালির মতো নিরামিষেই রুচি রাখে না। তাদের ডায়েট নানা রকম। সে কথায় পরে আসা যাবে। আগে দেখে নেওয়া যাক এরা ওড়ে কীভাবে। উড়ন্ত কাঠবিড়ালিরা যেটা করে তাকে ঠিক ওড়া বলতে নারাজ প্রাণীবিদরা। কারণ পাখিরা যেভাবে উড়তে পারে কাঠবিড়ালিরা সেটা পারে না। তারা মূলত ভেসে থাকতে পারে। মুক্ত ডানা নেই তাদের। হাত ও পায়ের মাঝে একটা পাতলা চামড়ার আস্তরণ আছে যাকে বলে ‘প্যাটজিয়াম’ (Patagium) । এর কাজ হল বাতাসের বাধা সরিয়ে কাঠবিড়ালিকে ভাসিয়ে রাখা। অনেকটা প্যারাশুটের মতো। গাছ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সময় এই প্যাটাজিয়াম তাদের বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে পারে। তাছাড়াও এদের হাতে থাকে কার্টিলেজ স্পার যা আঙুলগুলোকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে। ফলে ওই প্যাটাজিয়াম স্তর অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘক্ষণ তাদের ভাসিয়ে রাখতে পারে। হাত ও পায়ের তলায় থাকে নরম মাংসল অংশ, হাঁটাচলা করলে শিকারি প্রাণীরা খুব একটা টের পায়না।
তাজ্জবের ব্যাপার হল ৩০০ ফুট অবধি ভেসে থাকতে পারে এই কাঠবিড়ালিরা। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান মিউজিয়াম ও জুলজির গবেষকরা বলছেন, নর্দার্ন ফ্লাইং স্কুইরেলকে ৬৫ ফুট (২০ মিটার) অবধি বাতাসে ঝাঁপ দিয়ে ভেসে থাকতে দেখা গেছে। প্রয়োজন পড়লে ২৯৫-৩০০ ফুট অবধি ভেসে থাকতে পারে এই উড়ন্ত কাঠবিড়ালিরা। তবে কিছু প্রজাতির মধ্যেই এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন এশিয়ার রেড জায়ান্ট ফ্লাইং স্কুইরেল (Petaurista petaurista) । এদের দৈর্ঘ্য ৩২ ইঞ্চির মতো হয়, ওজন প্রায় ১.৮ কিলোগ্রাম। এই রেড জায়ান্টরা প্রায় ২৪৬ ফুট (৭৫ মিটার) অবধি বাতাসে গ্লাইড করতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, একটা ছোটখাটো ফুটবল স্টেডিয়াম পুরোপুরি চক্কর কেটে আসতে পারে এরা। উড়ন্ত কাঠবিড়ালিদের গ্লাইড করার ক্ষমতা সাঙ্ঘাতিক। শিকারি পাখি ও প্রাণীদের থেকে বাঁচার জন্য এই বৈশিষ্ট্য প্রাকৃতিভাবেই এসেছে তাদের মধ্যে।
আরও একটা চমক দেখা যায় উড়ন্ত কাঠবিড়ালিদের মধ্যে। গ্লাইড করা শুধু নয়, বাতাসে নিজের শরীরকে ১৮০ ডিগ্রি মোচড় দিতেও পারে এরা। বাজ, ঈগল বা পেঁচা পিছু ধাওয়া করলে তাদের নাকানিচোবানি খাইয়ে ছাড়ে উড়ন্ত কাঠবিড়ালিরা। পাখিদের মতো উড়তে না পারলেও নিজের শরীরকে ভাসিয়ে রেখেও শিকারিদের চোখে ধুলো দিতে পারে। আচমকাই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে ভিন্ন পথে ভেসে যেতে পারে এরা। দিক বদলের এই কৌশল ধরতে পারে না শিকারি পাখিরা। কিছু সময়ের জন্য হলেও নিস্তার পেয়ে যায় কাঠবিড়ালিরা।
গবেষকরা বলছেন, আমেরিকার প্রজাতিরা আকারে একটু ছোট হয়, এশিয়ার প্রজাতিরা আকারে ও ওজনে অনেকটাই বেশি। রেড ও হোয়াইট জায়ান্ট উড়ন্ত কাঠবিড়ালিদের দৈর্ঘ্য তিন ফুট অবধিও হতে পারে। ওজন দেড় কিলোগ্রামেরও বেশি। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে এই প্রজাতিদের দেখা বেশি মেলে।
ফলেই শুধু রুচি নেই উড়ন্ত কাঠবিড়ালিদের। এদের পছন্দের তালিকায় আছে পোকামাকড়, নানা ধরনেক ছত্রাক, পাখির ডিম। কানাডা, ফিনল্যান্ড, সাইবেরিয়ার মতো শীতপ্রধান দেশের উড়ন্ত কাঠবিড়ালিদের মধ্যে আরও একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শীতের আগেই তারা বাসা বেঁধে ফেলে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় এরা দলবন্ধ হয়ে থাকতে ভালবাসে। এমনকি একে অপরের সঙ্গে বাসাও ভাগ করে নেয়। বড় পরিবারের মতো মিলেমিশে থাকে। এই বৈশিষ্ট্য শীতপ্রধান দেশের উড়ন্ত কাঠবিড়ালিদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।
উড়ন্ত কাঠবিড়ালিদের অনেক প্রজাতিই আজ বিলুপ্তপ্রায়। এশিয়ার ৪৩ রকম প্রজাতির মধ্যে ৪০টিই বিলুপ্তির পথে। জঙ্গল কেটে বসতি তৈরি, নগর সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে উড়ন্ত কাঠবিড়ালিদের অস্তিত্বও বিপন্ন হতে বসেছে। নামদাফা ফ্লাইং স্কুইরেল (Biswamoyopterus biswasi) ভারতের নামদাফা ন্যাশনাল পার্কে ২০১২ সাল অবধি দেখা গিয়েছিল। মনে করা হয় ভারতে এখন এই একটি প্রজাতিই ঠিকে রয়েছে। যদিও তাদের সংখ্যা হাতে গোনা।