দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিড মহামারী পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের ভূমিকা নিয়ে এর আগেও সমালোচনা করেছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। আরও একবার কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নাম না করে প্রধানমন্ত্রীকেই তীক্ষ্ণ সমালোচনায় বিঁধলেন তিনি।
একটি ইংরাজি দৈনিকে সমসাময়িক নানান ঘটনা, দেশের পরিস্থিতি, অন্য দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফারাক— ইত্যাদি বিষয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অধ্যাপক সেন । সেখানেই তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ভারতে পাবলিক ডিসকাশন তথা প্রকাশ্যে আলাপ-আলোচনার বিষয়টাই আস্তে আস্তে তুলে দেওয়া হচ্ছে। যা কোভিড পরিস্থিতিতে গরিব মানুষকে আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
স্পষ্টতই তিনি বলেছেন, একমাত্র প্রকাশ্য আলোচনা-সমালোচনাই গরিব মানুষকে এই অতিমারীর কবল থেকে টেনে তুলতে পারে।
উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের উদাহরণ দিয়েছেন। অমর্ত্য সেনের কথায়, “দুর্ভিক্ষ খুব বেশি হলে ৫-১০ শতাংশের উপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু সেই সময়ে ব্রিটিশ সরকার সংবাদমাধ্যমকে দুর্ভিক্ষের কথা প্রচার করতে দেয়নি। খাদ্যের অভাব নিয়ে এক কলমও লিখতে দেওয়া হয়নি। কেউ সাহস করে তা করার চেষ্টা করলে তা বন্ধ করার জন্য নখদন্ত বের করে যা করার তাই করেছিল। কেন? তার কারণ শাসকের ভয় ছিল, দুর্ভিক্ষের কবলে পাঁচ থেকে দশ শতাংশ মানুষ পড়লেও সে কথা বেশি জানাজানি হলে আরও বড় অংশের মানুষ গর্জন উঠতে পারে।”
আলোচনা-সমালোচনার প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার কথায় বেশি করে গুরুত্ব আরোপ করেছেন অমর্ত্য সেন। তিনি বলেছেন, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অদৃশ্য বাধা কাজ করছে। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই, বিরোধী দলগুলি বারবার বলে মোদী জমানায় জাতীয় স্তরে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ হচ্ছে। এমনকি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেও এই অভিযোগ বিস্তর। পর্যবেক্ষকদের মতে, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ সেটিকেই বোঝাতে চেয়েছেন।
অধ্যাপক সেনের এই মন্তব্য নিয়ে অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার বলেছেন, “আমি অমর্ত্য সেনের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত। এর আগেও তিনি উদাহরণ দিতে দিয়ে বলেছিলেন, চিনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল সেই খবর চাপা দেওয়ার কৌশল নিয়েছিল তৎকালীন কমিউনিস্ট শাসকরা। এখানেও তাই হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছে না। সাংবাদিকদের ভয় দেখানো হচ্ছে। কেউ সাহস করে দু’কলম লিখলে তাঁকে দেশদ্রোহের মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম, আলোচনা-সমালোচনা, চর্চা—এগুলিই একটি সরকারকে ঠিক ভুল ধরিয়ে দেয়। যাতে সেই সরকার সংশোধিত পদক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি বর্তমান সময়ে নেই।”
অভিরূপবাবু আরও বলেন, “এই মহামারী পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অর্গানাইজেশনকে কার্যত অকেজ করে রাখা হয়েছে। যা শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, অশনি সঙ্কেতও বটে।”
যদিও কোভিড পরিস্থিতিতে বর্তমান চিন সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন অধ্যাপক সেন। তাঁর কথায়, “চিন যে ভাবে কোভিড পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং কোভিড পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে তার একটা আন্দাজ করে যে ধরনের পদক্ষেপ শুরু করেছে তা তারিফ যোগ্য। শুধু চিন করেছে বলে তার প্রশংসা যদি না করা হয় তাহলে তা বোকামো হবে।”
দেশের গণতান্ত্রিক পরিসর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব অমর্ত্য সেন। এই সাক্ষাৎকারেও তিনি বারবার বলেছেন, গণতন্ত্র বিকশিত না হলে, আলোচনার পরিবেশ তৈরি না হলে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ বের করা মুশকিল। এটাই প্রাথমিক ও বুনিয়াদি দিক। যা লঙ্ঘিত হচ্ছে।
অমর্ত্যর এই বক্তব্য নিয়ে বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে নোবেল জয়ীর এই জাতীয় বক্তব্যকে কখনই মানতে চায়নি গেরুয়া শিবির। তারা বরাবরই অমর্ত্যর এই জাতীয় বক্তব্যের সমালোচনা করে এসেছে।