দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্কুলের বারান্দায় সারি দিয়ে বসা। সামনে ভাতের থালা। হাতা থেকে চলকে পড়ে পাতলা ডাল, সঙ্গে একটু আলু-সয়াবিনের তরকারি। তাই অমৃত। খিদের পেটে হাপুস হুপুস করে খেয়ে নেয় বাচ্চারা। সে চাল বা ডালের গুণগত মান যাই হোক না কেন। মিড ডে মিল, আর তার লোভেই গ্রামগঞ্জের বাচ্চাদের স্কুলে ছুটে যাওয়া। আর তার জন্যই কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলের পথ ধরে বাচ্চারা। ভাঙাচোরা রাস্তা হোক, কাত হয়ে পড়া সেতু হোক, হাঁটাই একমাত্র উপায়।
আসলে দেশের একটা বড় অংশের শিশুই গরিব, অন্ত্যজ শ্রেণির। দুপুরের ভাত জোগাতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারকে। সেখানে পরিবহনের খরচ করার সমতো সামর্থ্য বা মনোভাব কারও নেই। ছেঁড়া চটি গলিয়েই কয়েক ক্রোশ পথ পেরিয়ে যেতে পারে বাচ্চারা। ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকাল অর্গানাইজেশনের (এনএসও) রিপোর্ট বলছেন, প্রত্যন্ত এলাকায় অন্তত ৫৯.৭ শতাংশ বাচ্চাই পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়। সে পথ যতই দুর্গম হোক বা পথের দূরত্ব যতই বেশি হোক না কেন। সমীক্ষা আরও বলছে, ছেলেদের থেকে মেয়েদের সংখ্যা আরও বেশি। প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে ৬২ শতাংশ মেয়েরা পায়ে হেঁটেই স্কুলে যায়, ছেলেদের সংখ্যা সেখানে ৫৭.৯ শতাংশ।
একেবারে গণ্ডগ্রামগুলিতে এই সংখ্যা আরও বেশি। এনএসও বলছে, ভাঙা সেতু, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, দীর্ঘ পথের ক্লান্তি পেরিয়ে ৬০ শতাংশের বেশি ছেলেমেয়ে সেখানে হেঁটেই স্কুলের পথ ধরছে। সারা গ্রামে হয়তো একটাই স্কুল। বাড়ি থেকে তার দূরত্বও বেশি। আর হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুল হলে হয়তো আরও দুই থেকে তিনটে গ্রাম পেরিয়ে যেতে হয়। পরিবহনের খরচ করার মতো সামর্থ্য অনেকেরই নেই। সমীক্ষা বলছে, শহরে যেখানে ১৫.৩ শতাংশ বাচ্চা গণপরিবহনের সুবিধা পায়, গ্রামে সেই সংখ্যা হাতে গোনা। সামান্য স্বচ্ছল পরিবারগুলি হয়তো পরিবহনের সুবিধা নিতে পারে তাও সেই সংখ্যা ১১ শতাংশের বেশি নয়।

ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকাল অর্গানাইজেশনের আগের সমীক্ষাগুলিতে দেখা গিয়েছিল, আট থেকে দশ বছর বয়সী বেশিরভাগ শিশুই স্কুলছুট হচ্ছে। এর কারণ হয়তো অনেক। পথের দূরত্ব, বিনা পয়সার স্কুলে সন্তানদের পাঠাতেও গরিব পরিবারগুলির যথেষ্ট খরচ হয়। বেশিরভাগই মনে করে পড়াশোনার বদলে শিশুটি রোজগার করলে পরিবারের লাভ হবে। ধরা যাক, একটি পরিবারের মাসিক আয় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। মেয়ে বা ছেলেকে যদি বাবা-মা স্কুলে না পাঠান তাহলে দিনমজুরি করে তাদের আয় হবে আরও দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। আর অন্তত দশ বছর পড়াশোনা করে ছোটখাটো অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ, বা কারখানায় কাজ পেতে আরও অনেকটা সময় পেরিয়ে যাবে। সমীক্ষা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, স্কুলে পড়াশোনার গড়পড়তা হার এখনও বেশ কম। তাই বাচ্চাদের স্কুলমুখো করতে সরকারি ব্যবস্থায় মিড ডে মিলের লোভ দেখানো হয়, কিন্তু সেখানেও অনেক গলদ। জীর্ণ স্কুলবাড়ি, শিক্ষক না এলেও গ্রামের পরিবারগুলো প্রতিবাদ করে না। গরিব শিশুরা নিয়মিত স্কুল যায় না, অনেকেই স্কুল ছেড়ে দেয় প্রাথমিকের গণ্ডি না পেরোতেই। যে ক’দিন স্কুলে আসে তখনও যে পড়াশোনায় খুব আগ্রহ দেখায়, এমনও নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি সবকটি বিষয়ের সঠিক রূপায়ণ না হলে গরিব পরিবারের শিশুদের শিক্ষায় আগ্রহই তৈরি হবে না।