দ্য ওয়াল ব্যুরো: অপেক্ষা আর মাত্র চারদিনের। শুক্রবার ভোর পাঁচটায় তিহাড় জেলে একই সঙ্গে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে নির্ভয়ার চার অপরাধী অক্ষয় ঠাকুর, মুকেশ সিং, বিনয় শর্মা ও পবন গুপ্তকে। বাঁচার সব রাস্তাই কার্যত বন্ধ। ফাঁসি মকুব করে যাবজ্জীবনের আর্জিও শোনা হয়নি। এমনকি জেলের ভিতরে ধর্ষণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ এনেও আকেরে লাভ হয়নি। ফাঁসি হচ্ছেই, পষ্টাপষ্টি জানিয়ে দিয়েছে দিল্লি আদালত। ছেলেদের বাঁচাতে এবার আসরে নেমেছেন তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান-সহ পরিবারের আপনজনেরা।
‘‘বাঁচতে চাই না। নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন গ্রাহ্য করা হোক। ক্ষমা যখন মিলবেই না, তখন আমাদেরও বেঁচে থেকে কী লাভ,’’ রাষ্ট্রপতির কাছে নিষ্কৃতি-মৃত্যু বা ইউথ্যানাসিয়ার আর্জি জানিয়ে চিঠি লিখেছেন চার অপরাধী পরিবারের লোকজন। সূত্রের খবর, চিঠির বয়ান হিন্দিতে। তাতে চার আসামির মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও পরিবারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের স্বাক্ষর রয়েছে। চিঠির বয়ান বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়. ‘‘রাষ্ট্রপতির কাছে একান্ত আবেদন আমাদের নিষ্কৃতি মৃত্যুর দাবি পূরণ করা হোক। নির্ভয়া ঘটনার মতো এমন অপরাধ যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে এবং আদালতকে একসঙ্গে চারজনকে ফাঁসিতে ঝোলাতে না হয়, সেই জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।’’
আদালতে মামলা চলার সময় অক্ষয় ঠাকুরের পরিবার আগেই দাবি করেছিল, ২০১২ সালের ওই ঘটনার জন্য অক্ষয় দায়ী নয়। তাদের দাবি ছিল, ঘটনার সময় অক্ষয় নাকি তার গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন। আইনজীবী এপি সিং বাসের টিকিটও পেশ করেছিলেন আদালতে। চার আসামির বাবা-মায়ের দাবি, ‘‘আমাদের দেশে অনেক বড় অপরাধীকেও ‘মহাপাপী’ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। প্রতিশোধ নেওয়া শক্তি ও ন্যায়ের পরিচয় নয়। আসল শক্তি হল ক্ষমা।’’
দিনকয়েক আগেই তিন দণ্ডিতের আইনজীবী এপি সিং দিল্লি আদালতে দাবি করেছিলেন, তাঁর মক্কেলদের মারধর করা হয়েছে জেলে। মান্ডোলি জেলের দুই পুলিশকর্মী নাকি পবনের হাত মুচকে দিয়েছেন, জেলের দেওয়ালে তাঁর মাথাও ঠুকে দেওয়া হয়েছে। পবনের মাথায় আঘাত নাকি গুরুতর। ওই দুই পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার আর্জিও জানিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে, সমস্ত রকম আইনি পথ ফের খতিয়ে দেখার আর্জি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দাখিল করেছে আসামি মুকেশ সিং। মুকেশের অভিযোগ, তাঁর আইনজীবী নাকি ভুল পথে চালনা করেছিলেন। কাজেই সমস্ত রকম আইনি পথ ফের খতিয়ে দেখা হোক।
ফাঁসি থেকে বাঁচার মরিয়া চেষ্টা এর আগেও বহুবার করেছে চার আসামি। দিল্লির নিম্ন আদালত যে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছিল সেটা ছিল ২২ জানুয়ারি। তখনই তুরুপের তাস ছেড়েছিলেন এপি সিং। ফাঁসির রদের পিটিশন, রায় সংশোধের আর্জি তথা কিউরেটিভ পিটিশন, এরপরেও রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন, সেই আবেদন বাতিল হলে তার পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফের রিভিউ পিটিশন—একে একে আইনের সবকটা অস্ত্রকে ঝুলি থেকে বার করেন তিনিই। প্রথমবার ফাঁসি রদ হয়, যখন সুপ্রিম কোর্টে রায় সংশোধনের আর্জি জানিয়েছিল দুই অভিযুক্ত। সেই আর্জি খারিজ হওয়ার পর দিল্লির নিম্ন আদালতের ওই মৃত্যু পরোয়ানার রায় চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছিল মুকেশ সিং। মুকেশের আইনজীবীকে সেই পরামর্শও নাকি দিয়েছিলেন এপি সিং। প্রথমবার মৃত্যু হাত থেকে বেঁচে নাকি এপি সিংয়ের পায়ে পড়েছিল অক্ষয়, বিনয় ও পবনের পরিবার।
অক্ষয় ঠাকুরের রিভিউ পিটিশনে দিল্লির দূষণ, হিন্দু পুরাণ এমনকি মহাত্মা গান্ধীকে টেনে এনে উদ্ভট যুক্তি সাজিয়ে আদালতের সময় নষ্ট করার পরিকল্পনাও তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। ১৪ পাতার সেই রিভিউ পিটিশনে এপি সিং লিখেছিলেন, “বেদ, পুরাণ, উপনিষদ অনুযায়ী যুগের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয়ুও কমে। আগে মানুষ হাজার বছরের বেশি বাঁচত, এখন কলিযুগ। এই যুগে মানুষের আয়ু কমে ৫০-৬০ বছরে এসে ঠেকেছে। খুব কম মানুষই ৮০-৯০ বছর পর্যন্ত বাঁচেন। আয়ুই যখন কম, তখন আর মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়ে কী হবে!” দ্বিতীয়বার ফাঁসির দিন ঠিক হওয়ার আগে যখন দীর্ঘ টালবাহানা চলছে, এপি সিং হঠাৎই রটিয়ে দেন তিহাড় জেলে তাঁর মক্কেলরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। এমনকি তাঁদের পিটিশন দাখিল করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও নাকি দিতে দেরি করছেন জেন কর্তৃপক্ষরা। এখানেই শেষ নয়। জেল কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় তুলে, ফের ফন্দি আঁটেন অজয় প্রকাশ। এবার মুকেশের আইনজীবী বৃন্দার সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন জেলের ভিতরে যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে চার দোষীকে। সেই প্রচেষ্টাও ধোপে টেকেনি। এবার তাই আসরে নেমেছেন আসামিদের পরিবারের লোকজন।