কসবা কাণ্ডের (Kasba Law College) সূত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেই বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। যে বিদ্রোহের হোতা দলের মুখর সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ( AITC Vs Kalyan Banerjee)।
.jpeg.webp)
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 28 June 2025 23:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কসবা কাণ্ডের (Kasba Law College) সূত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেই বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। যে বিদ্রোহের হোতা দলের মুখর সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ( AITC Vs Kalyan Banerjee)। ল’কলেজের ঘটনা নিয়ে শনিবার বিস্ফোরক সব কথা বলেছিলেন কল্যাণ। তাঁর কথায়, “লজ্জা লাগে! এতদিন ধরে দল করছি, এমন বিকৃত মানসিকতার লোক আমাদের দলে থাকবে কেন? যারা এই ঘৃণ্য অপরাধ করেছে, তাদের দল থেকে বার করে দেওয়া উচিত।” কল্যাণের বিশ্বাস, এমন লোককে বের করে দিলে মানুষ তাতে খুশি হবে অখুশি হবে না।
এরপরই দলের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, কল্যাণের বক্তব্যকে দল সমর্থন করছে না। দলের এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করে বলা হয়, “দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজে সংঘটিত ভয়ঙ্কর অপরাধ নিয়ে সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিধায়ক মদন মিত্র যে মন্তব্য করেছেন, তা তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। তৃণমূল কংগ্রেস স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে, এই মন্তব্যগুলির সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই এবং দল এই বক্তব্যগুলিকে তীব্রভাবে নিন্দা করে। এই মতামতগুলি কোনওভাবেই দলের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।”
এতেই তেলেবেগুণে চটে যান শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ। এআইটিসি-র এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করা মানে সেটা দলেরই অবস্থান জানানো। তৃণমূলের সেই পোস্ট নিয়ে খোলাখুলি আপত্তি জানান কল্যাণ। বলা ভাল, তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এক্স হ্যান্ডেলে পাল্টা পোস্ট করে কল্যাণ বলেন, “ এক্স হ্যান্ডেলে তৃণমূলের পোস্টের সঙ্গে আমি একেবারেই একমত নই। তাঁরা কি পরোক্ষে সেই নেতাদেরই সমর্থন করছেন, যাঁরা অপরাধীদের আড়াল করছেন?”

কল্যাণের কথায়,“শুধু একাডেমিক বা তাত্ত্বিক বক্তব্য দিয়ে বাস্তবে কোনও পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, যদি না অবিলম্বে সেইসব নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাঁরা সরাসরি দায়ী”।
কল্যাণ এর পর যে কথাটি বলেন তা বিতর্কে ইন্ধন জোগাতে যথেষ্ট। তিনি বলেন, “সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, ২০১১ সালের পর যাঁরা নেতৃত্বে এসেছেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ এমন সব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগের মুখে পড়েছেন। আমি স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, আমি কোনওভাবেই তাঁদের পাশে নেই, যাঁরা এই অপরাধীদের উৎসাহ দিচ্ছেন বা রক্ষা করছেন। আমার বক্তব্য ও অবস্থানের অন্তর্নিহিত মানে বোঝার জন্য এক ধরনের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংহতি প্রয়োজন — যা দুঃখজনকভাবে অনেকের মধ্যেই অনুপস্থিত।”
গত বুধবার সন্ধ্যায় কসবা আইন কলেজের গার্ড রুমে আটকে রেখে নির্যাতিতাকে ধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠে শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের এক ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারিণী নিজেও শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের কর্মী। তদন্তে নেমে মূল অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা তথা আইনজীবী মনোজিৎ মিশ্র এবং কলেজের দুই বর্তমান পড়ুয়া জইব আহমেদ এবং প্রমিত মুখোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করে পুলিশ। শনিবার গ্রেফতার করা হয় কলেজের এক নিরাপত্তা রক্ষীকেও।
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে বলেছিলেন, “নিরাপত্তা ব্যবস্থা তো আছেই। কিন্তু যদি একজন বন্ধু তাঁর বান্ধবীকে ধর্ষণ করে, সেখানে নিরাপত্তা কী করতে পারে?"
যদিও শনিবার কার্যত উল্টো সুরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যাবতীয় ক্ষোভ উগরে দেন কল্যাণ। এদিন শ্রীরামপুরের এক দলীয় কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “আইন না থাকলে এদের ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে গুলি করে মারা উচিত। যারা ধর্ষণে জড়িত, তাদের ফাঁসি হওয়া উচিত। আইন আছে বলেই তারা বেঁচে যাচ্ছে।”
শনিবার সকালে কসবার ঘটনা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন তৃণমূল নেতা মদন মিত্রও। তিনি আবার বলেছিলেন,"মেয়েটি যদি ওখানে না যেত তাহলে এরকম ঘটনা ঘটত না। গেছিল যখন অন্তত কয়েকজন বন্ধুকে বলে বা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারত। তাহলে এমন হত না। অভিযুক্তরা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে।"
মদনের এই মন্তব্য থেকে তৃণমূল যে দূরত্ব রাখবে বা তা নিয়ে নিন্দা করবে তা প্রত্যাশিতই ছিল। তবে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে কল্যাণের অবস্থানের সঙ্গে।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, ব্যাপারটা দুটি দিক রয়েছে। এক, কংগ্রেসি ঘরানার রাজনীতিতে দলের সঙ্গে এরকম খোলাখুলি মতান্তর নতুন নয়। বরং এটা চিরাচরিত সংস্কৃতি। এর মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক ব্যাপার রয়েছে। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হল, তৃণমূলে চলতি সেই পুরনো দ্বন্দ্ব—নবীন বনাম প্রবীণ। এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কিছু প্রবীণ নেতা মনে করেন, ২০১১ সালের পর যাঁরা দলে এসেছেন তাঁদের অনেকেই সুবিধাবাদী, দলের প্রতি নিষ্ঠাবান নন, দুর্নীতিপরায়ণ এবং উচ্ছৃশঙ্খল।
আরও একটি বিষয় এখানে নজরে রাখার মতোই। তৃণমূলের এক্স হ্যান্ডেল আই-প্যাকই পরিচালনা করে। এবং দলের মধ্যে অনেকের ধারণা হল, আই প্যাক মানেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে গোটা ব্যাপারটা কি এখন অভিষেক বনাম কল্যাণ হয়ে গেল! এই পর্ব এখানেই তাই শেষ হবে বলে মনে করা হচ্ছে না। বরং বলা ভাল, ক্রমশ।