
শেষ আপডেট: 17 June 2022 08:18
বিক্ষোভের আগুনের মুখে পড়েছে নরেন্দ্র মোদীর ‘অগ্নিপথ’ (Agnipath)। বুধবারই প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। বৃহস্পতিবার তা মাত্রা ছাড়ায় বেশ কিছু রাজ্যে।
করোনার কারণে গত দু-বছর সেনা বাহিনীতে নিয়োগ বন্ধ ছিল। কিন্তু অবসর আটকে থাকেনি। ফলে শূন্যপদ হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। এই সমস্যা পৃথিবীর সব দেশেই হয়েছে।
এই সুযোগে আমাদের সরকার আর পাঁচটা ক্ষেত্রের মতো সেনার চাকরিতেও ঠিকা ব্যবস্থা চালু করতে চাইছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রস্তাব হিসাবে বিবেচনাধীন থাকাকালে গত মাস তিন-চারেকের মধ্যে দু'বার এই প্রকল্প নিয়ে আগাম খবর প্রকাশিত হয়েছে দ্য ওয়াল-এ।

অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও সরকারের এই ভাবনার কথা প্রচার করেছে। কেউই সম্ভবত অনুমান করেননি, এই স্কিম নিয়ে সরকারকে এতটা বিড়ম্বনায় পড়তে হবে। বিষয়টি সেনা চাকরি সংক্রান্ত বলেই কেউই সরকারি ঘোষণার আগে ভাল-মন্দ নিয়ে মুখ খোলেননি। কিন্তু সরকারি কর্তারা বিক্ষোভের সম্ভাবনা আঁচ করেননি, গোয়েন্দারা ব্যর্থ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ভুল হবে। বরং, সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ মোদী সরকার এবং বিজেপির বর্তমান উন্নাসিক, আত্মজাহির পরায়ণ নেতৃত্ব জনপ্রতিবাদকে মনে করে দেশদ্রোহীতা এবং রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়েই তারা প্রতিবাদীদের মোকাবিলা করতে চায়।
যদিও সরকার ঘোষণা করার পর অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্তাদেরও অনেকেই বলছেন, সিদ্ধান্তটি সেনার পক্ষে ভাল হবে না। অতএব দেশেরও অমঙ্গল।
নতুন স্কিম চালুর কারণ হিসাবে এক মহৎ যুক্তি হাজির করেছে সরকার—খরচ কমবে। কারণ, অগ্নিপথ স্কিমে নিযুক্ত সেনাদের ৭৪ শতাংশকে চার বছরের মাথায় চাকরি থেকে বসিয়ে দেওয়া হবে। সেই জায়গায় ফের নতুন ছেলেমেয়েদের নেওয়া হবে। এইভাবেই চলতে থাকবে।
চার বছর মাথায় বসে যাওয়ার সময় ৭৫ শতাংশ সেনা এককালীন যে অর্থ হাতে পাবেন তার অর্ধেকটা তাদেরই বেতন থেকে কেটে নেওয়া টাকা। নিয়মিত সেনারা অবসরের পর যে সব সুযোগ সুবিধা পান অগ্নিবীরেরা তা পাবেন না।
নাই বা পেলেন, বীর তকমাটা কম কী! নিয়মিত অর্থাৎ স্থায়ী পদে কাজ করা সেনাদেরও এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা মেলে না।
কোনও সন্দেহ নেই সেনার চাকরিতে ঝুঁকি আছে। সে কথা জেনেই কিছু মানুষ সেনার চাকরিতে যান। তাদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধায় নতশির।
সেনায় চাকরির অভিজ্ঞতা কত ভয়ঙ্কর হতে পারে ইন্টারনেটের যুগে ঘরে বসেই তা বুঝে নেওয়া আরও সহজ হয়ে গিয়েছে। সীমান্তে সেনার লড়াইয়ের দৃশ্য দেখার সময় মন কেঁদে ওঠে জওয়ানদের কঠিন কঠোর, কষ্টের জীবনযাপন দেখে। সেই সূত্রে চাকরির প্রয়োজনটাও বেশ বোঝা যায়।
আমাদের মতো কোটি কোটি বেকারের দেশে সেনার এই কঠিন চাকরিও গুপ্তধন পাওয়ার সমান। সেনা বাহিনীই হল সেই প্রতিষ্ঠান যেখানে একটা সময় বলতে গেলে নিরক্ষরেরও চাকরি জুটত।
অগ্নিপথের বিরোধিতায় উত্তাল উত্তরপ্রদেশ! বালিয়ায় জ্বলছে ট্রেন, ভাঙা হল স্টেশন, তৎপর পুলিশ
একটু পুরনো কথা বলি। রবীন্দ্রসদনের অদূরে গোখেল রোডে আর্মির অফিসে একটা সময় ভোর থাকতে দূর-দূরান্ত থেকে ছেলেরা ভিড় জমাত নিয়োগ পরীক্ষার খোঁজখবর নিতে। বিমান বাহিনীর নিয়োগ নিয়ে খবর সংগ্রহের জন্য যেতে হত পলতায়। নৌবাহিনী নিয়ে খোঁজ খবর পাওয়া যেত তাদের হেস্টিংস অফিসে গেলে। সাংবাদিকতার পেশায় একেবারে গোড়ায় চাকরি-ব্যবসা ইত্যাদি বিষয়ক একটি সাপ্তাহিকের জন্য খবরের সন্ধানে এই সব অফিসে নিয়মিত যেতাম। এই পেশায় এসে উদরপূর্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বড় মুখ করে বলার মতো যে এক দুটি মন খুশি করা কাজ করেছি, তার একটি হল, সেনার চাকরির সুলুক সন্ধান দিতে পেরেছি বহু মানুষকে। ফার্স্ট ট্রেন ধরে আমিও যেতাম গোখেল রোডের অফিসে, খবরের সন্ধানে।
সেনার চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে তখন বহু তরুণ দূর-দূরান্ত থেকে ভোর ভোর এসে ময়দান এলাকায় দৌড়ঝাঁপ করে শরীর তৈরি করত। এক অফিসার স্বেচ্ছায় তাঁদের নানা ধরনের পরামর্শ দিতেন। সেনায় চাকরির বিপুল সুযোগের কথা বলতে গিয়ে বাংলাভাষী এক অফিসার খানিক মজা করে বলতেন, যার নাই কোনও গতি, সেও হবে সেনাপতি। অর্থাৎ সরকারি চাকরির সেরা ঠিকানা ছিল সেনাবাহিনী। দেশের ভূ-প্রকৃতি এবং চিন আর পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করতে করতে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বাহিনী হয়ে উঠেছে ভারতীয় সেনা (Indian Army)।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেনায় চাকরির ধরনধারণ যেমন বদলেছে, তেমনই সুযোগ সুবিধাও বেড়েছে অনেক। জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী সেনা প্রধান হওয়ার পর সরকারের সঙ্গে দর কষাকষি করে সেনার বেতন একলাফে অনেকটা বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। সেই থেকে সেনার চাকরি অনেক লোভনীয়। তখন থেকে বন্ধ হয় মাঝপথে চাকরি ছাড়ার প্রবণতা।
নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিং'রা সেই সেনার খাতেই খরচ কমাতে চাইছেন। সে জন্য তাঁরা থাবা বসাতে চাইছেন বেতন ও পেনশন খাতে ব্যয়ের বোঝায়।
একথা ঠিক, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মানুষের প্রয়োজন হয়তো সেনাতেও কমেছে। কিন্তু বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে সেনা খাতে খরচ কমানোর কথা বলছে, তা তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মেলে না। বরং তারা উল্টোটা অর্থাৎ বাহিনীতে লোকবল আরও বাড়ানো, সেনার চাকরিতে আরও নজরকাড়া সুযোগসুবিধা দেওয়ার কথা বলতে হয়তো কেউই অবাক হতেন না। বিশেষ করে যে সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর বুকের ছাতি নিয়ে গর্ব করে থাকে তারা সামরিক বাহিনীর প্রতি আরও বেশি নিবেদিত প্রাণ হবে, এটা ভাবাই স্বাভাবিক।
কিন্তু তারা সে পথে না হেঁটে সেনার চাকরিকে আকর্ষণহীন করে তুলতে চাইছে। পরিবর্তে যা করতে চাইছে তাতে কয়েক বছর পর পাড়াগুলি সব সেনায় ভরে যাওয়া অসম্ভব নয়।
হতে পারে বর্তমান সরকার এটাই চাইছে যে এভাবেই পাড়া, মহল্লা সেনাবাহিনী ফেরৎ যৌবনে ভরে যাক। হতেই পারে তারা চার বছর ঠিকায় চাকরি করার পর বাতিল তকমা পাওয়া সেনা। কিন্তু সেনা তো বটে। তার উপর অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিবীর।
যদিও চার বছরে প্রশিক্ষণ এবং ছুটিছাটা বাদ দিলে খুব বেশি বছর আড়াই ময়দানে কাজ করার সুযোগ মিলবে। ফলে যুদ্ধে, সংঘর্ষে বীরত্ব দেখানোর সুযোগ মিলবে হাতে গোনা কয়েকজনের। তাতে তাঁদের অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিবীর মর্যাদায় কেউ থাবা বসাতে পারবে না। চাকরিবাকরির দৌড়ে বাজার মূল্য যদি অর্থনৈতিক কারণে না’ও মর্যাদাপূর্ণ হয়, দাপুটে সামাজিক বাহিনী হয়ে ওঠায় তো কোনও বাধা থাকছে না। সেটা অসম্ভবও নয়। অসহায় অবস্থায় বীরের মর্যাদা পুঁজি করে স্বঘোষিত রামা-শ্যামা বনে গিয়ে তারা সমাজ শাসক হয়ে উঠবে না, কে বলতে পারে!
‘অগ্নিপথ’ বিক্ষোভে বিহারে হামলা উপমুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে, বিজেপি অফিস, অশান্তি তেলেঙ্গানাতেও
এই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন কেউ তুলতেই পারেন, নিয়মিত সেনারা অবসরের পর কি এলাকা শাসন করে বেড়ান? না, তা করেন না। এখনও এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলি পাকিস্তান, বাংলাদেশের মতো গণহারে অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের দলে, প্রশাসনে পুনর্বাসনের পথে হাঁটেনি। সেই পথে হেঁটে প্রতিবেশী দেশ দুটিতে সমাজের সামরিকীকরণ কী বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে তা কারও অজানা নয়। সরকারি দফতর থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত, পুরসভা, সমবায়, ক্লাব, সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্তারা আসীন। যে কারণে দেশ দুটিতে বহুল ব্যবহৃত শব্দের একটি হল, ‘অবসরপ্রাপ্ত’।

সেখানে ভারতীয় সেনা রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ বাহিনী। বাহিনীতে পূর্ণ সময় কাজ করার ফলে তারা যে সংস্কৃতি আত্মস্থ করে তা তাদের অবসর জীবনেও সামাজিক ও রাজনৈতিক পদ-ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতে প্ররোচিত করে। প্রতিবেশী দেশ দুটির ঠিক উল্টো।
তা ছাড়া, নিয়মিত সেনারা অবসর নেন মাঝ বয়সে। সেখানে অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিবীরদের বয়স হবে খুব বেশি হলে পঁচিশ- ছাব্বিশ। সেনা বাহিনীতে চার বছর কাটিয়ে আসা অস্ত্র প্রশিক্ষণ পাওয়া এই বয়সি ছেলেমেয়েদের চটজলদি চাকরির ব্যবস্থা করা না গেলে তারা কোন পথে পা বাড়াতে পারে, কী ধরনের আচরণ করতে পারে সে দিকটা সরকার ভেবে সিদ্বান্ত নিয়ে থাকলে বলতেই হয় সেনা খাতে খরচ কমানো ছাড়াও অন্য বিশেষ উদ্দেশ্য থাকা অসম্ভব নয় এই প্রকল্প চালুর পিছনে।
‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প ঘোষণার জন্য সময়টা বাছা হয়েছে খুবই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী যেদিন সেনায় ঠিকা চাকরির কথা ঘোষণা করলেন সেদিনই প্রধানমন্ত্রী দেড় বছরে দশ লাখ চাকরির কথা ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ পরোক্ষে বার্তা দেওয়া হল, চার বছর পর অবসর নিয়ে ফিরে আসা অগ্নিবীরদের জন্য বিপুল চাকরির সুযোগ অপেক্ষা করবে। শুধু তাই নয়, অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিবীরদের চাকরির উপযোগী করে তুলতে বিশেষ কোর্স, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি মহা-আয়োজনের কথা বলা হচ্ছে। ফলে সরকারের খরচ আদতে কমবে না, বরং বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। তারপরও সেনা বাহিনীতে চার বছরের চুক্তির চাকরির সিদ্ধান্ত কেন, সেটা সত্যিই রহস্য।
সরকার অবসরের পর চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে। যদিও বাস্তব হল, পনেরো-কুড়ি বছর চাকরি করার পর অবসর নেওয়া সেনাকেও নতুন চাকরি জোটাতে ফেউ ফেউ করে ঘুরতে হয়। ফলে বছর বছর সেনা বাহিনী থেকে বাতিলের কারণে অবসর নেওয়া তরুণ ছেলেমেয়েদের চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে দুর্ভাবনা স্বাভাবিক। রাস্তায় প্রতিবাদের প্রধান কারণ সেটাই।
কিন্তু নয়া ঘোষণার পিছনে এক বৃহত্তর সামাজিক বিপদের আশঙ্কা অমূলক নয়। চাকরি যাওয়া প্রশিক্ষিত তরুণ সেনানীদের উপযুক্ত নতুন চাকরির ব্যবস্থা করা না গেলে তারা ক্রমে সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোগুলিকে আশ্রয় করবে, আঁকড়ে ধরবে। উল্টোটাও হওয়া অসম্ভব নয়, রাজনৈতিক দল, প্রভাবশালী সংগঠন তাদের জন্য দরজা খুলে দিল। এভাবেই অদৃশ্য বন্দুকধারীরা সমাজ শাসক হয়ে উঠবে না, কে বলতে পারে! হতে পারে সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব জেনে বুঝেই সেই পথ আহ্বান করছে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনে।