দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা চিকিৎসায় সলিডারিটি ট্রায়াল থেকে বাদ পড়তে চলেছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের নাম। কোভিড-১৯ সংক্রমণ সারাতে ম্যালেরিয়ার ওষুধের যে কোনও কার্যকরী ভূমিকাই নেই সেটা ফের একবার স্পষ্ট করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। ভারতে এতদিন প্রফিল্যাক্সিস ড্রাগ হিসেবে এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর অনুমোদনে মৃদু সংক্রামিত করোনা রোগীদের চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ব্যবহার হচ্ছিল। তবে হু-র নির্দেশিকা মেনে দেশের ২২টি ক্লিনিকাল রিসার্চ সেন্টারে এই ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বন্ধ হতে চলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সলিডারিটি কমিটির চেয়ারম্যান জন আর্ন রটিনজেন বলেছেন, বিশ্বের ২১ দেশের সাড়ে তিন হাজার করোনা রোগীর উপর হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ট্রায়ালে কোনও সন্তোষজনক ফল মেলেনি। এমনকি দেখা গেছে, করোনার সংক্রমণ কমাতে এই ওষুধের কোনও কার্যকরী ভূমিকাই নেই। উল্টে ওষুধের ডোজের হেরফেরে রোগীদের শরীরে খারাপ প্রভাব পড়ছে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের সলিডারিটি ট্রায়াল গ্রুপের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছেন রয়েছেন হু-র চিফ সায়েন্টিস্ট ডক্টর সৌম্য স্বামীনাথন। ভারত থেকে ওই গ্রুপে রয়েছেন পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট এবং অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রাক্তন ডিরেক্টর ডাক্তার শ্রীনাথ রেড্ডি, আইসিএমআর-ন্যাশনাল এইডস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (NARI)-এর এপিডেমোলজি বিভাগের প্রধান ডক্টর শীলা গোড়বোলে। ডক্টর রেড্ডি বলেছেন, দেশের ২২টি জায়গায় প্রায় ৩০০ জনের উপরে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছিল। সেটা এখন বন্ধ করে দেওয়া হবে। নতুন নির্দেশিকা জারি করে বলা হয়েছে, প্রফিল্যাক্সিস ড্রাগ হিসেবেই হোক বা করোনার থেরাপিতে, আপাতত হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের প্রয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। ডক্টর গোড়বোলের কথায়, ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধকের তুলনায় করোনার চিকিৎসায় ভাল কাজ করেছে রেমডেসিভির ও ইন্টারফেরন বিটা-১এ। সলিডারিটি ট্রায়ালে এই দুই ওষুধকেই আগে রাখা হচ্ছে। এইচআইভি-র ওষুধ লোপানিভির-রিটোনাভিরের প্রয়োগও বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
করোনা চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে যে ৭০ রকমের ড্রাগ নিয়ে সলিডারিটি ট্রায়াল চলছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে। এই ওষুধের নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা সামনে আসায়, করোনা সারাতে আদৌ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিরাপদ কিনা সেই নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনও তথ্য এখনও মেলেনি। ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নাল দাবি করেছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের বেশি ব্যবহারে করোনা রোগীদের মৃত্যুহার বাড়তে পারে। বিশেষ করে হার্ট এরিদমিয়া দেখা দিতে পারে। ল্যানসেটের গবেষণায় বিশ্ব জুড়ে কয়েকশ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৯৬ হাজার রোগীর রেকর্ড খতিয়ে দেখে সেই রিপোর্ট সামনে আনা হয়েছিল। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিও তাদের রিকভারি ট্রায়ালের রেজাল্ট সামনে এনে বলেছে, করোনা সারাতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন কোনও কাজই করেনি, বরং এই ওষুধের প্রয়োগে রোগীদের মৃত্যুহার বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও আইসিএমআর প্রথমে বলেছিল, করোনার চিকিৎসায় না হলেও রোগ প্রতিরোধ বাড়াতে প্রফিল্যাক্সিস ড্রাগ হিসেবে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ব্যবহার চলতে পারে। পরে আপডেটেড গাইডলাইনে আইসিএমআর জানায়, মৃদু বা মাঝারি কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়েছে যেসব রোগীর, তাদের চিকিৎসায় এই ওষুধের প্রয়োগ করা হবে। তবে নির্দিষ্ট ডোজে এবং রোগীদের শারীরিক পরীক্ষার পরে সঠিক গাইডলাইন মেনে।
গত ১০ থেকে ১২ জুন হু-র সলিডারিটি ট্রায়াল কমিটির সঙ্গে আলোচনার পরে দেশে এই ওষুধের ক্লিনিকাল ট্রায়াল বন্ধ করারই সিদ্ধান্ত নেয় আইসিএমআর। আইসিএমআর-ন্যাশনাল এইডস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (NARI)-র ডিরেক্টর ডক্টর সমীরন পান্ডাও বলেছেন, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের কোনও সুফল এখনও দেখা যায়নি। তাছাড়া সাইড এফেক্টস বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার একটা ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে। সেই কারণেই আপাতত সলিডারিটি ট্রায়াল থেকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।