
শেষ আপডেট: 20 July 2018 09:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে সংসদে বিতর্ক হবে, আর তাতে নাটকীয় চড়াই উতরাই থাকবে না, কখনও হয়েছে!
কিন্তু শুক্রবার যেন অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ফেললেন রাহুল গান্ধী।
টানা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে ঝাঁঝালো বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি ফালাফালা করে দিতে চাইলেন রাহুল। তার পর বক্তৃতা শেষ করেই সটান হাঁটা লাগেন ট্রেজারি বেঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর আসনের দিকে। ঝুঁকে পড়ে আলিঙ্গনে বেঁধে ফেললেন মোদীকে। রাহুলকে জড়িয়ে ধরলেন মোদীও। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব মোদী। অবাক চোখে তাকিয়ে সনিয়া! বিস্ময়ে বিদ্ধ গোটা লোকসভা।
ওটাই ফ্রেম! আস্থা ভোটে জেতা-হারা, তর্ক-বিতর্ক যা হোক দিনের ছবি হয়ে গেল সেটাই। দৃশ্যগুণে সংসদের আর্কাইভেও ঢুকে গেল এই ফ্রেম! এবং কংগ্রেস সভাপতি তথা গান্ধী পরিবারের তরুণ প্রজন্ম রাহুল যেন আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন, তিনি মিস্টার আনপ্রেডিক্টেবল! চিরাচরিত রাজনীতির ভাষা তাঁর অভিধানে নেই। সমালোচনা যাই হোক, তাঁর রাজনীতির ব্যকরণ অন্য।
কেন্দ্রে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে চন্দ্রবাবু নায়ডুর তেলুগু দেশম পার্টি। তাতে সমর্থন জানিয়েছে কংগ্রেস। সেই বিতর্কে অংশ নিয়েই এ দিন লোকসভায় বক্তৃতা দেন রাহুল।
গোড়া থেকেই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে খোঁচা থাকলেও শুরুটা রাহুল করেছিলেন শান্ত সৌম্য ভাবেই। কিন্তু তার পর যা হয়। তাঁর প্রতিটা কথাতেই যখন চিৎকার করে আপত্তি করতে থাকেন বিজেপি সাংসদরা, সুর চড়ান রাহুলও। বলেন, এই তেলুগু দেশম এক সময় বিজেপি-র শরিক ছিল। কিন্তু তাঁরাও চিনে গিয়েছেন মোদীকে। কারণ, মোদীর একটা অস্ত্রে শরিক বন্ধু বিরোধী থেকে শুরু করে গোটা দেশ শিকার হয়েছে। তা হল ‘জুমলা’। অর্থাত ভাঁওতা। পরক্ষণেই লড়াকু বিমান রাফাল চুক্তি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন রাহুল। বলেন, বেছে বেছে দেশের ধনীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব নরেন্দ্র মোদীর। তাদেরই একজনকে প্রতিরক্ষা বরাত পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ৪৫ হাজার কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। কিন্তু রাফালের দাম জানতে চাইলেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলছেন, চুক্তি অনুযায়ী তা বাইরে বলা যাবে না। রাহুল জানান, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে, তিনি বলেছেন চুক্তিতে এরকম কোনও শর্তই নেই।
রাহুলের এ কথা শুনেই শরীর কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাতেও দমেননি রাহুল। বলেন, “প্রধানমন্ত্রী উপরে হাসছেন, কিন্তু ভিতরে নার্ভাস। প্রধানমন্ত্রী আমার চোখে চোখ রাখতে পারছেন না।”
শুধু প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, মোদী সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন কংগ্রেস সভাপতি। প্রধানমন্ত্রীকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, কোন রসায়নে মোদীজির বন্ধুর ব্যবসা ১৬ হাজার গুণ বাড়ে! প্রধানমন্ত্রী সে ব্যাপারে কেন চুপ? কেন শুধু ১৫ জন ২০ জন শিল্পপতির ঋণ মাফ করা হচ্ছে। কেন কৃষকদের মকুব করা হচ্ছে না!
https://twitter.com/ANI/status/1020236522736345094সব শেষে মোদী-অমিত শাহকে এক প্রকার ব্যক্তি-আক্রমণ করে রাহুল বলেন, ওঁরা আমাদের থেকে আলাদা। সংসদে সবার থেকে আলাদা। কারণ, সংসদে বাকি যাঁরা রয়েছেন তাঁরা জানেন সংসদীয় রাজনীতিতে হার জিত রয়েছে। পরাজয় এলে তা মেনে নিতে হবে। কিন্তু মোদী-অমিত শাহ হারতে ভয় পান। ক্ষমতা থেকে চলে গেলে ওঁদের সব শেষ হয়ে যাবে বলেই ভয় ওঁদের। সেই ভয় থেকেই আসছে রাগ। আর সেই রাগ গোটা দেশের মধ্যে চারিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। সমাজে বিভাজন তৈরি করতে চাইছেন।
এ কথা বলেই হিন্দুত্বের প্রসঙ্গে আসেন রাহুল। বলেন, আমি যে হিন্দু তা ওঁদের আক্রমণের ফলেই জানতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি। এবং বুঝেছি হিন্দু ধর্ম ভালবাসতে শেখায়। ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়াতে নয়। আপনি আমাকে 'পাপ্পু' বলতে পারেন, কিন্তু আমি আপনাকে ঘৃণা করি না। আপনার ভিতর থেকে ঘৃণাটা বার করে এনে আমি ভালোবাসায় পরিণত করব। আমি কংগ্রেস।এবং এখানে বক্তৃতা শেষ করেই সটান প্রধানমন্ত্রীর আসনের দিকে হাঁটা লাগান রাহুল। তাঁকে আলিঙ্গন করে নিজের আসনে ফিরে এসে ফের বলেন, প্রধানমন্ত্রী এটাই হিন্দুত্ব। আমার-আপনার মতান্তর থাকতেই পারে। কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা থাকবে না কেন?
অনাস্থা বিতর্কে শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর জবাবি বক্তৃতা হওয়ার কথা। এখন দেখার রাহুলকে কী জবাব দেন মোদী?