
শেষ আপডেট: 20 May 2023 07:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শনিবার দুপুরে কর্নাটকে শপথ গ্রহণ করবে সিদ্দা-শিব মন্ত্রিসভা। মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেবেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সি সিদ্দারামাইয়া। তাঁর উপমুখ্যমন্ত্রী হবেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ডিকে শিবকুমার (Shivkumar)। কর্নাটক হবে দেশের ১২তম রাজ্য যেখানে মন্ত্রিসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী (deputy chief minister) থাকবেন। ১২ রাজ্য মিলিয়ে উপমুখ্যমন্ত্রীর সংখ্যা অবশ্য ১৭জন। শুধু অন্ধ্রপ্রদেশেই পাঁচজন উপমুখ্যমন্ত্রী আছেন। উত্তরপ্রদেশে আছেন দু’জন।
গত শনিবার কর্নাটক বিধানসভার ফল ঘোষণার পর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ নিয়ে সিদ্দা ও শিবের লড়াইয়ে কেটে যায় পাঁচটা দিন। শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দাবি ছেড়ে উপমুখ্যমন্ত্রী হতে রাজি হয়েছেন শিবকুমার। তবে তাঁর দাবি মেনে উপমুখ্যমন্ত্রী পদে তিনি একাই থাকবেন। তিনজন উপমুখ্যমন্ত্রী করার পরিকল্পনা শিবকুমারের চাপেই বাতিল করতে হয়েছে কংগ্রেস হাইকমান্ডকে।
বাস্তবে সংবিধানে এমন কোনও পদেরই উল্লেখ নেই। তবু কেন্দ্রে উপপ্রধানমন্ত্রীর মতো রাজ্যে রাজ্যে উপমুখ্যমন্ত্রী পদ আছে। আছে সেই পদে বসার জন্য তীব্র লড়াই, রেষারেষি।
স্বাধীনতার পর কেন্দ্রের প্রথম মন্ত্রিসভাতেই উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন বল্লভভাই পটেল। নেহেরুর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধিতার পাশাপাশি ব্যক্তিত্বের লড়াইও চাপা থাকেনি। মূল বিরোধ ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে। সরকারি টাকায় গুজরাতের সোমনাথ মন্দির সংস্কার এবং রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের পুনর্গঠিত মন্দির উদ্বোধন কিছুতেই মানতে পারেননি নেহরু। আরও অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার আগে থেকে নেহরু ও পটেলের মতবিরোধী রাজনীতির চর্চার বিষয় ছিল।

তারপর দীর্ঘ ব্যবধান কাটিয়ে ১৯৭৭ সালে মোরারজি দেশাইয়ের মন্ত্রিসভায় উপপ্রধান মন্ত্রী হন চৌধুরী চরণ সিং। তিনি পরে অল্পদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাঁর স্বল্পকালীন মন্ত্রিসভায় উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন জগজীবন রাম এবং যশবন্তরাও চবন। সেই দুই সরকারেই উপমুখ্যমন্ত্রীরা ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর গলার কাঁটা।

১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর সরকারকে হঠিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেন জনতা দলের নেতা তথা প্রাক্তন কংগ্রেসি বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। সেই মন্ত্রিসভায় উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লোকদল নেতা দেবী লাল। রাষ্ট্রপতি ভবনে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দেবী লালকে নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপকে। শপথবাক্য পাঠের সময় দেবী লাল ‘উপ’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। যার অর্থ দাঁড়ায় তিনিও প্রধানমন্ত্রী। পাশ থেকে রাষ্ট্রপতি ‘উপ’ ‘উপ’ বলে শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করলেও দেবী লাল দমেননি। শেষে তাঁকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে নতুন করে শপথ বাক্য পাঠ করতে বলা হয়। দেবী লাল সেদিন ভুল করেছিলেন নাকি গোটাটাই ছিল পয়লা দিন থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে টক্কর দেওয়ার বার্তা, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলে পরবর্তী বহু বছর। সেই মন্ত্রিসভা বেশি দিন টিকতে না পারার একটি কারণ ছিল প্রধানমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রীর পদে পদে বিরোধ।

তারপর আবার দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় উপপ্রধানমন্ত্রী পদে কেউ ছিলেন না। অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী লালকৃষ্ণ আদবানীকে উপপ্রধানমন্ত্রী করেন। দু’জনের মধ্যে কখনও কোনও বিষয়ে মতবিরোধ হয়ে থাকতে পারে, তবে তা প্রকাশ্যে আসেনি। আসলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদবানীকে না জানিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতেন না বাজপেয়ী। বহু ফাইলেই তিনি ‘পুট ইট বিফোর ডিপিএম’ (ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার) বলে নোট দিয়েছেন, সাধারণ নিয়মে যা আদৌ আদবানীর কাছে যাওয়ার কথা নয়। উপপ্রধানমন্ত্রী আদবানী ছিলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বাজপেয়ী তাঁর সমসাময়িক আদবানীকে উপপ্রধানমন্ত্রী করলেও নরেন্দ্র মোদী মন্ত্রিসভার বর্ষীয়ান সদস্য তথা প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিংহকে উপপ্রধানমন্ত্রী করা হয়নি। উপপ্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব ছিল প্রয়াত মনোহর পারিক্করকেও। কিন্তু মোদী সবুজ সংকেত দেননি।
যদিও উপপ্রধানমন্ত্রী বা উপমুখ্যমন্ত্রী বলে কোনও পদের উল্লেখ সংবিধানে নেই। সংবিধানের ৭৫ নম্বর অনুচ্ছেদে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এবং ১৬৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাজ্য মন্ত্রিসভার উল্লেখ আছে। কোনওটিতেই উপপ্রধানমন্ত্রী, উপমুখ্যমন্ত্রীর উল্লেখ নেই। দেবী লালকে উপপ্রধানমন্ত্রী করার পর সুপ্রিম কোর্টে তাঁর নিয়োগ নিয়ে মামলা হয়। শীর্ষ আদালতকে সরকারের তরফে অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, দেবী লাল আর পাঁচজন মন্ত্রীর মতোই মন্ত্রিসভার একজন সদস্যমাত্র।
তবে সংবিধানে থাকুক বা না থাকুক উপপ্রধানমন্ত্রী কিংবা উপমুখ্যমন্ত্রী পদের গুরুত্ব নির্ভর করে ব্যক্তি রাজনীতিকের ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক ওজনের উপর। এই ব্যাপারে বাংলার দৃষ্টান্তটিই যুৎসই। ৫৪ বছর আগে, ১৯৬৭ সালে বাংলায় প্রথম অকংগ্রেসি জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন কয়েকটি জেলায় সীমাবন্ধ ছোট্ট দল বিপ্লবী বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়। উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তিন বছর আগে তৈরি পার্টি সিপিএমের জ্যোতি বসু। তিনি ছিলেন পুলিশ তথা স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্বে। সেই সরকারে মুখ্যমন্ত্রী আর উপমুখ্যমন্ত্রীর বিবাদই ছিল তখনকার রাজনীতির রোজনামচা। এমনকী পুলিশের ভূমিকায় বিরক্ত মুখ্যমন্ত্রী অজয়বাবু নিজের সরকারকেই অসভ্য, বর্বর বলে গাল পাড়েন। ক্রমে জ্যোতিবাবুর ব্যক্তিত্বের কাছে ঢাকা পড়ে যান তিনি। শুধু তাই নয়, ১৯৬৭’র পর ১৯৬৯, পর পর দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রী থাকার সুবাদে জ্যোতিবাবুর রাজনীতিতে বিকাশ এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ১৯৭৭ সালের পালা বদলে বিশেষ কাজে এসেছিল।
বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জ্যোতি বসুর (Jyoti Basu) মন্ত্রিসভায় কৃষ্ণপদ ঘোষ, বিনয় চৌধুরীর মতো প্রথমসারির সিপিএম নেতা এবং ননী ভট্টাচার্য, কানাই ভট্টাচার্যের মতো শরিক নেতারা মন্ত্রিসভায় থাকলেও কেউই উপমুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পাননি। সম্ভবত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনায় রেখেই বামফ্রন্টের শরিকেরা ওই পদটি নিয়ে আকচা-আকচি করেননি।

অনেক পরে ১৯৯৬ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়। সেবার তথ্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি পুলিশ দফতরও দেওয়া হয় তাঁকে। জ্যোতিবাবুর সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে বুদ্ধদেববাবু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেও তা উপমুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগের ঘটনা। তাঁকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয় মুখ্যমন্ত্রী পদে জ্যোতিবাবুর উত্তরসূরি হিসাবে তৈরি হওয়ার সুযোগ দিতেই।
আসলে সংবিধানে না থাকলেও উপপ্রধানমন্ত্রী, উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয় মূলত কর্নাটকের মতো দলীয় দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতির সমীকরণ, জাতপাতের অঙ্ক, শরিকি বোঝাপড়ার কারণে। অন্ধ্রপ্রদেশে জাতিগত সমীকরণ বিবেচনায় রেখে পাঁচজনকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। একই কারণে উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের মন্ত্রিসভায় দু’জন উপমুখ্যমন্ত্রী আছেন।
আবার শরিক দলকে খুশি রাখার অঙ্কে হরিয়ানায় বিজেপির মনোহরলাল খট্টরের মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক দলের তরুণ নেতা দুষ্মন্ত চৌতালাকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। শরিকি অঙ্কেই বিহারে দেশের মধ্যে রেকর্ড সময়, টানা আট বছর নীতীশ কুমারের মন্ত্রিসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিজেপির সুশীলকুমার মোদী। ভিন্ন দলের হলেও ছাত্রাবস্থায় এক সঙ্গে রাজনীতি করা নীতীশ ও সুশীল মোদীর মধ্যে সরকারি কাজে বিবাদ না হওয়ার পিছনে কাজ করেছে পুরনো সম্পর্ক ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার মানসিকতা। এখন দেখার কর্নাটকে সিদ্দা-শিব সম্পর্ক কেমন থাকে। উপমুখ্যমন্ত্রী হয়ে শিবকুমার নিজেকে কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
রাহুল শনিবার সব দলের নজরে, বেঙ্গালুরুর মঞ্চে নিজেকে কীভাবে তুলে ধরবেন