দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনার টিকা এলেও সংক্রমণ কতটা রোখা যাবে সেই নিয়ে চিন্তিত বিজ্ঞানীমহল। ইম্পিরিয়াল কলেজ অব লন্ডনের বিজ্ঞানীরা এর মধ্যেই বলেছেন, প্রথম ভ্যাকসিনেই পুরোপুরি নির্মূল হবে না করোনা। শুধুমাত্র সংক্রমণের কারণে জটিল রোগের প্রকোপ কমবে। অনেকটা সেই দিকেই ইঙ্গিত করেছেন মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশিয়াস ডিজিজের ডিরেক্টর এবং হোয়াইট হাউসের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অ্যান্থনি ফৌজি।
“সংক্রমণের এই পর্যায়েতে সুরক্ষা দিতে পারবে ভ্যাকসিন। কিন্তু অনন্তকাল ধরে এর প্রভাব টিকবে না। একটা মানুষকে সারাজীবন করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারবে না ভ্যাকসিন,” ফৌজির বক্তব্য এমনটাই।
করোনার প্রথম ধাক্কাই এখনও সামলে ওঠা যায়নি, বলেছেন ফৌজি। দ্বিতীয় ধাক্কার আশঙ্কা করা হচ্ছে। চিনে ইতিমধ্যেই দ্বিতীয়বার করোনার সংক্রমণে বহু মানুষ আক্রান্ত। আমেরিকায় সংক্রমণ লাগামছাড়া। ৩০ লাখের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। ফৌজি বলেছেন, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ভ্যাকসিনের প্রথম কয়েকটি ডোজে প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। কিন্তু করোনার মতো সংক্রামক ভাইরাস যা জিনের গঠন বদলেই চলেছে, তার বিরুদ্ধে শক্তপোক্ত বর্ম গড়ে তোলার জন্য যেধরনের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ শক্তির দরকার, সেটা এখনই আসবে না মানুষের শরীরে। তাই এখনই বলা যাচ্ছে না যে, ভ্যাকসিন সারা জীবনধরেই কোভিড সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারবে।
উদাহরণ স্বরূপ ফৌজি বলেছেন, মিসলস বা হামের টিকা যেমন মানুষকে সারাজীবন সুরক্ষা দেয়, করোনার ভ্যাকসিনে তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, সার্স-কভ-২ আরএনএ ভাইরাস বারে বারেই জিনের গঠন বদলাচ্ছে (জেনেটিক মিউটেশন)। এর প্রতিটি স্ট্রেন একে অপরের থেকে আলাদা। তাই এই ভাইরাসের উৎসের খোঁজ এখনও মেলেনি। যেসব স্ট্রেন থেকে ভ্যাকসিন বানানো হচ্ছে তার বাইরেও করোনার একাধিক সংক্রামক স্ট্রেন রয়েছে। কারণ জেনেটিক মিউটেশনের ফলে জিনের গঠন বিন্যাস বদলে ফেলছে ভাইরাস। তাই সাময়িকভাবে একটা পর্যায় অবধি সুরক্ষা দিতে পারবে ভ্যাকসিন। ভবিষ্যতে যদি এই ভাইরাস ফের তার চেহারা বদল করে ফিরে আসে, তাহলে তার মোকাবিলা এই ভ্যাকসিনে হবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ফৌজি বলেছেন, পুরো ব্যাপারটাই অনিশ্চিত। কারণ, এই ভাইরাস কতদিন ধরে তার জীবনচক্র চালাবে সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না।
মানুষের শরীরে বিভাজিত হওয়ার সময় বা প্রতিলিপি তৈরির সময় একটা নির্দিষ্ট অ্যামাইনো অ্যাসিডের কোড বদলে দিচ্ছে সার্স-কভ-২, এমনটা আগেও বলেছিলেন অ্যান্থনি ফৌজি। তাঁর বক্তব্য ছিল, মনে করা হচ্ছে করোনার জিনের সিঙ্গল অ্যামাইনো অ্যাসিড কোড বদলাচ্ছে। জিনের একটা রিডিং ফ্রেম থাকে, তাতে তিনটে বেস থাকে। প্রতি বেসে একটি করে অ্যামাইনো অ্যাসিডের কোড থাকে। ফৌজি বলছেন, হতেই পারে এই অ্যামাইনো অ্যাসিডের কোড গুলো বদলে দিচ্ছে ভাইরাস। যার কারণেই মানুষের শরীরে ঢোকার ও সংক্রমণ ছড়াবার নতুন নতুন রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে করোনা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই বলেছে করোনাকে সঙ্গে নিয়েই বাঁচার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ইম্পিরিয়াল কলেজ অব লন্ডনের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রথম ভ্যাকসিনেই রোখা যাবে না করোনাকে। একই দাবি শিকাগো ইউনিভার্সিটির এপিডেমোলজিস্টদের। তাঁদের বক্তব্য, রুটিন চেকআপ, বছরে একবার বা দু’বার ভ্যাকসিন অথবা কোভিড প্রতিরোধী ওষুধ খেয়েই ভাইরাসের মোকাবিলা করতে হবে। তাছাড়া, মাস্ক, স্যানিটাইজার, বারে বারে হাত ধোওয়ার অভ্যাস ও পারস্পরিক দূরত্ববিধি তো রয়েছেই। অর্থাৎ সতর্কতা দিয়েই সংক্রমণ ঠেকানোর ব্যবস্থা করতে হবে, কারণ ভ্যাকসিনে দীর্ঘমেয়াদী ফল পাওয়া যাবে কিনা সেটা এখনও অনিশ্চিত।