দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে যাঁরা লড়ছেন, তাঁদের তালিকায় সবচেয়ে আগে আসে স্বাস্থ্যকর্মীদের নাম। এই অসম লড়াইয়ে তাঁদের হাতে না আছে ওষুধ, না প্রতিষেধক। অন্যদিকে হু হু করে ছড়িয়ে পড়া এই রোগ ইতিমধ্যেই প্রাণ কেড়েছে লক্ষাধিক মানুষের। তবু হাস ছাড়েননি তাঁরা। দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছেন প্রতিটি দেশের স্বাস্থ্যকর্মীরা। সেই জন্যই তো করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যাটাও প্রায় ১০ লক্ষ ছুঁতে চলেছে।
কিন্তু এত বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েও, নিজেদের প্রাণ ঝুঁকির মুখে রেখেও, এত মানুষের প্রাণ ফিরিয়েও তার বিনিময়ে তাঁরা কি যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন? এদেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে চিকিৎসকদের ওপরে ঘটা অন্যায়ের কথা।
এবার জানা গেল, চিকিৎসক নিগ্রহে পিছিয়ে নেই পশ্চিমী দেশ মেক্সিকোও। করোনার চিকিৎসা করার 'অপরাধে' হেনস্থার শিকার হলেন সে দেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সামিল হয়েছেন বিক্ষোভ-প্রতিবাদেও।

মহামারী কোভিড ১৯ যখন একের পর এক শহরকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে ছেড়েছে, সাধারণ মানুষের কাছে তখন ঈশ্বর হয়ে উঠেছেন চিকিৎসকরা। তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে নানা উপায়ও অবলম্বন করা হয়েছে নানা দেশে। কোথাও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গান-বাজনার মধ্যে দিয়ে, কোথাও বা কাঁসর-ঘণ্টা পিটিয়ে তাঁদের সম্মান জানানো হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে, হেনস্থাও কিছু কম জুটছে না তাঁদের। এদেশেই শোনা গেছে, করোনা রোগীর চিকিৎসা করার জন্য কোথাও স্বাস্থ্যকর্মীকে ভাড়া বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও বা মৃত ডাক্তারের সৎকার করা নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন স্থানীয় মানুষ। এই সব ঘটনার খবর বারবারই আমাদের মাথা হেঁট করেছে।
একই রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন মেক্সিকোর চিকিৎসকরাও। জানা যায়, সম্প্রতি উত্তর মেক্সিকোর চিকিৎসক জোসে আর্তুরো ভেরা একটানা অনেকটা সময় ধরে ডিউটি করে ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলেন হাসপাতাল থেকে। রাস্তায় খানিক এগোনোর পরেই পথ আটকায় পুলিশ। অভিযোগ, তাঁর পেশা জানার পরে একটি পুলিশের পেট্রোল কার তাঁর পিছু নেয় এবং তাঁর বাড়ি পর্যন্ত এসে বাড়ির ছবি তুলতে থাকে।
[caption id="attachment_213948" align="aligncenter" width="699"]

চিকিৎসক ভেরার তোলা ছবি।[/caption]
তিনি প্রতিবাদ করলে ডঃ ভেরাকে মারতে শুরু করে পুলিশ এবং গ্রেফতারও করে! চিকিৎসক ভেরা জানান, বিনা অপরাধেই শুধু চিকিৎসক হওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে অপরাধীর মতো ব্যবহার করা হয়, মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার করা হয়! সেই ঘটনার পর মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন ভেরা। এখনও কাজে যোগদান করতে পারেননি তিনি।
ইনস্টিটিউট অফ মেক্সিকান সোশ্যাল সেফটি (আইএমএসএস) আয়োজিত একটি কনফারেন্সে তাদের নার্সিংয়ের প্রধান সদস্যা ফ্যাবিয়ানা জেপাদা বলেছেন, নিজেদের পরিচিত মানুষও দুর্ব্যবহার করছেন তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁরা চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছেন মানেই তাঁরা করোনা বহন করছেন না। এই ধরনের হেনস্থা তাঁদের প্রাপ্য নয়।

ইতিমধ্যেই মেক্সিকোয় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তৃতীয় ধাপে পৌঁছতে চলেছে। এই সময় সব থেকে বেশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের। তার পরেও অসম্মান জুটছে কপালে।
তাঁদেরই মধ্যে একজন ব্লাঙ্কা ইমেলদা। এই মাসের শুরুর দিকে একদিন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আচমকা তার মুখে ব্লিচিং সলিউশন ছুড়ে মারা হয়! পরে ব্লাঙ্কা জানান, আক্রমণকারীকে তিনি দেখতে পাননি। কানে এবং মুখে ঠান্ডা তরল অনুভব করেন হঠাৎই। সাময়িক ভাবে অন্ধও হয়ে যান তিনি।
সান্দ্রা আলেমেন নামে আর এক পুরুষ নার্স সম্প্রতি একটি স্টোর থেকে বেরিয়ে পথে নেমেই হঠাৎই একটি ছেট বাচ্চার কাছে শোনেন, "কাছে আসবেন না। আপনি করোনা বহন করছেন।" একটি ছোট বাচ্চার মুখে এমনটা শুনে স্বাভাবিক ভাবেই চমকে যান সান্দ্রা। তবে চমকের আরও বাকি ছিল। সান্দ্রা এর পরেও বাচ্চাটির দিকে এগোলে, তার এসে সান্দ্রাকে রীতিমতো মারধর করেন বলে অভিযোগ! সান্দ্রার হাতের আঙুলও ভেঙে যায়!

এগুলি কোনটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বারবার এই ঘটনা ঘটছে তাঁদের সঙ্গে। তাঁরা জানান, ডাক্তার-নার্সদের পোশাক এতদিন তাঁদের কাছে গর্বের ব্যাপার ছিল। কিন্তু এই ঘটনাগুলির পরে তাঁরা সেই পোশাক পরে জনসমক্ষে আসতেই ভয় পাচ্ছেন।
মেক্সিকো জুড়ে এনিয়ে বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসক এবং নার্সরা নিরাপত্তার দাবিতে মুখর হয়েছেন। একদিকে তাঁরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত পরিষেবা দিচ্ছেন, তার বিনিময়ে জুটছে নিগ্রহ!
