দ্য ওয়াল ব্যুরো: শাহিনবাগের আন্দোলনে চার মাসের শিশুর মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছে তাকে। আরও অবাক করেছে, সন্তানকে হারিয়েও তার বাবা-মায়ের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা। তার মনে হয়েছে, এমনটা স্বাভাবিক নয়। তাই সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দেওয়ার আবেদন জানিয়ে প্রধান বিচারপতি এসএ বোবদেকে চিঠি লিখল ১২ বছরের এক ছোট্ট মেয়ে, জেন গুণরতন সাদাভার্তে।
দিনের পর দিন খোলা আকাশের নীচে থাকার কারণে ঠান্ডা লেগে শিশুটির মৃত্যুর ঘটনা গভীর দাগ কেটেছে কৈশোরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট জেনের মনে। সে সাহসিকতার পুরস্কার বিজয়ী এক বালিকা। ২০১৯ সালে মুম্বইয়ের এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ বাঁচিয়েছিল বহু মানুষের। জেনের মনে হয়, এমনটা হতে পারে না। কিছু করা উচিত। ক্লাস সেভেনের ছাত্রী চিঠিতে লিখেছে, বিক্ষোভ-অবস্থানে শিশুদের নিয়ে আসা বন্ধ করার পিটিশন দিতে চায় সে। তার আরও দাবি, এই নিয়ে তদন্ত হোক এবং ওই অভিভাবকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
মুম্বইয়ের বাসিন্দা জেন গুণরতন জানিয়েছে, তার মনে হয়, এভাবে শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। তার অভিযোগ, ছোট শিশুরা জানেও না প্রতিবাদ কী। তাদের অনিচ্ছায় বা অজ্ঞানতায় বিক্ষোভে আনা হচ্ছে তাদের, অযত্ন করা হচ্ছে। জেনের কথায়, ‘‘আমি দেখলাম এক চার মাসের শিশু মারা গিয়েছে, তাও মর্মান্তিক ভাবে। এতে ওর স্বাভাবিক ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ওর বেঁচে থাকার অধিকার এবং মানবাধিকারও লঙ্ঘিত হচ্ছে। আমি প্রধান বিচারপতিকে পিটিশন জমা দেওয়ার কথা বলেছি।''
কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতায় দিল্লির শাহিনবাগে প্রায় দু’মাস ধরে অবস্থান-বিক্ষোভ চলছে। সেখানেই সামিল হয়েছিলেন দিল্লির বাটলা হাউস এলাকার দম্পতি আরিফ এবং নাজিয়া। তাঁদের তিন সন্তান। কনিষ্ঠতম জাহানের বয়স মাত্র চার মাস। অত ছোট বাচ্চাকে কার কাছেই বা রেখে আসবেন, তাই কোলে করেই সঙ্গে আনতেন তাকে। সমকালীন সময়ের সবচেয়ে বড় আন্দোলনের সাক্ষী থাকত সে।
অল্প দিনের মধ্যেই সকলের মন কেড়েছিল ছোট্ট জাহান। আন্দোলনকারীদের কোলে কোলে ফিরত সে। কেউ খাইয়ে দিতেন, তো কেউ ঘুম পাড়াতেন যত্ন করে। কেউ আবার খুনসুটি করে নরম গালে তুলি ছুঁইয়ে এঁকে দিতেন জাতীয় পতাকা। নিজের মা-বাবার সঙ্গে গেলেও, জাহান যেন হয়ে উঠেছিল গোটা আন্দোলনের সন্তান। আন্দোলনের কনিষ্ঠতম মুখও হয়ে উঠেছিল সে। কিন্তু দিল্লির হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দিনের পর দিন ধরে খোলা আকাশের নীচে থেকে ঠান্ডা লেগেছিল ছোট্ট শরীরে। কয়েক দিন লড়াই চলার পরে, শেষমেশ ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু হয় মহম্মদ জাহানের।
মা-বাবা বলেন, “ওর ঠান্ডা লেগেছিল। ৩০ তারিখ রাতে ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরি আমরা। ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিই তার পরে। আমাদের আর দুই সন্তান পাঁচ বছরের মেয়ে আর এক বছরের ছেলেকেও ঘুম পাড়াই। আমরাও ঘুমিয়ে পড়ি ক্লান্ত হয়ে। সকালে উঠে দেখি, জাহান নড়ছে না। শরীর ঠান্ডা।”
ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ছোটেন নাজিয়া-আরিফ। কিন্তু চিকিৎসকরা জানান, রাতে ঘুমের মধ্যেই মারা গেছে সে। ভেঙে পড়েন তাঁরা। আন্দোলনের এত বড় মাসুল দিতে হবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।
পেশায় রিকশা চালান আরিফ। জরির কাজে সাহায্য করেন নাজিয়া। নিম্নবিত্ত পরিবারে শোকের ছায়া নেমেচে সন্তানকে হারিয়ে। কিন্তু এতটুকু ম্লান হয়নি আন্দোলনের আঁচ। তাঁরা বলছেন, “আমার আরও দুই সন্তান আছে। ওদের ভবিষ্যতের জন্য তো লড়তেই হবে। ধর্মের কারণে ওদের যাতে দেশছাড়া হতে না হয়, সে জন্যই তো লড়াই।”