দ্য ওয়াল ব্যুরো: আধার কার্ড নিয়ে শতকরা ৯০ ভাগ প্রাপ্তবয়স্কের মনেই রয়েছে ভ্রান্ত ধারণা। একটি সমীক্ষায় তা দেখা গেছে। তাঁরা মনে করেন, আধার করানোর সময় তাঁরা যে আঙুলের ছাপ, রেটিনার ছবি দিয়েছেন (বায়োমেট্রিক তথ্য), তা একেবারে নিরাপদ। শুধু তাই নয়, ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরেও লোকে মনে করেন, ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে আধার কার্ড আবশ্যিক।
সম্প্রতি ডালবার্গ নামে একটি সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে। ‘স্টেট অফ আধার: আ পিপলস পার্সপেক্টিভ’ নামে ওই সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই বিশ্বাসই করেন যে, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের জন্য আধার আবশ্যিক।
সমীক্ষায় আধার কার্ড নিয়ে লোকের ধারণা উঠে এসেছে, আধার নিয়ে তাঁরা কতটা আবেগপ্রবণ সে কথাও উঠে এসেছে এই সমীক্ষায়। আধার থেকে তাঁরা কী সুবিধা পান ও কী সুবিধা পান না, সে ব্যাপারেও তাঁদের মতামত জানতে চাওয়া হয়। ওমিদবার নেটওয়ার্ক ইন্ডিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই সমীক্ষার ব্যয়ভার বহন করেছে।
৮০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ বিশ্বাস করেন যে সরকারি ভর্তুকি ও সুযোগসুবিধা যেমন পেনশন, রেশন প্রভৃতি পাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য হল আধার কার্ড।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ৭৫ শতাংশেরই এখন আধার রয়েছে। ২০০৯ সালে এই কার্ড চালু হয়। বেশিরভাগ রাজ্যে যখন প্রায় সকলেরই আধার কার্ড রয়েছে সেখানে ব্যতিক্রম হল দু’টি রাজ্য – অসম ও মেঘালয়। অসমে ৯০ শতাংশ ও মেঘালয়ে ৬০ শতাংশ বাসিন্দার আধার নেই। সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, “অসমের মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়েছেন আধারে নাম নথিভুক্ত করতে গিয়ে।”
দেশের মধ্যে একমাত্র অসমেই জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ হয়েছে, এখানে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে নাগরিকপঞ্জী থেকে। জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হয়েছে এ বছরের ৩১ অগস্ট।
উত্তর-পূর্ব ভারতে আধার পঞ্জিকরণের হার কম তো বটেই, যাঁরা আধার কার্ডে তথ্য সংযোজন-পরিবর্তন করতে গেছেন, তাঁদের অনেকেই ব্যর্থ হয়েছেন। শতকরা ৩৩ জন নাগরিক মনে করেন, আধার কার্ডে তথ্য সংযোজন-পরিবর্তন অত্যন্ত দুরূহ কাজ। তাঁদের প্রতি পাঁচ জনে অন্তত একজন এই আপডেট করতে পারেননি।
দেশে ৮ শতাংশ বা ১০.৩ কোটি বাসিন্দার এখনও আধার কার্ড নেই। এদের বেশিরভাগই (৭৩ শতাংশ বা সাড়ে সাত কোটি) অপ্রাপ্তবয়স্ক, এদের আবার তিন ভাগের এক ভাগের বয়স পাঁচ বছরের নীচে।
ডালবার্গ এশিয়ার আঞ্চলিক অধিকর্তা সৌরভ গুপ্ত বলেন, “আধারের গুণাগুণ বা সুবিধা-অসুবিধা বিচার করা আমাদের বিবেচ্য ছিল না। আমাদের বিবেচ্য ছিল দেশের নাগরিকদের আধার সম্বন্ধে কী ধারণা তা জানা এবং আধারের প্রয়োগ আরও ভাল ভাবে করার পরিকল্পনা করা। যাঁরা দৈনন্দিন জীবনে আধার কার্ডের ব্য়বহার করছেন এবং যাঁরা তা করতে পারছেন না তাঁদের দেখে আমাদের যা অভিজ্ঞতা হল ও কতটা কী বুঝতে পারলাম তার উপরেই নির্ভর করছে আধারের সাফল্য।”
এখন দেশের ১২০ কোটি মানুষের আধার কার্ড রয়েছে। রেশন পাওয়ার জন্য এঁদের ৩৯ শতাংশ কার্ড গ্রাহকই নিয়মিত ভাবে তাঁদের আধার-যুক্ত বায়োমেট্রিক ব্যবহার করে চলেছেন, ২৯ শতাংশ ভারতীয় তাঁদের মাসিক বিভিন্ন পরিষেবা পাচ্ছেন এই কার্ডের মাধ্যমে।
দেশের ৭২ শতাংশ নাগরিকই তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার সংযুক্তিকরণ করেছেন, দেশে যত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তার ৮৭ শতাংশই এখন আধার বা ইউনিক আইডেন্টিটির সঙ্গে সংযুক্ত। শুধু আর্থিক ক্ষেত্রই নয়, ৪৭ শতাংশ ছাত্রছাত্রীকে এখন স্কুলে নাম নথিভুক্ত করতে হয়েছে হয় নিজের, অথবা মা-বাবার মধ্যে কোনও একজনের আধার কার্ড সংযুক্তির মাধ্যমে।
কৃষিক্ষেত্রে সামাজিক সুযোগসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আধারের বড় ভূমিকা রয়েছে। দেশের ৯০ শতাংশ কৃষক তাঁদের সারের ভর্তুকি পাওয়ার জন্য অন্তত একবার আধার কার্ড ব্যবহার করেছেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, মোবাইল ফোনে নতুন সিম কার্ড নেওয়ার জন্য অন্তত ৪১ শতাংশ ভারতীয় আধার কার্ড ব্যবহার করেছেন।
যে কোনও কাজে পরিচয়পত্র হিসাবে আধার কার্ডকে মোটামুটি সকলেই মেনে নিয়েছেন। তবে কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক নিযুক্ত বিচারপতি শ্রীকৃষ্ণের নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি সরকারের কাছে পার্সোন্যাল ডেটা প্রোটেকশন বিলের প্রস্তাব করেছেন এবং একই সঙ্গে এই বিলের প্রয়োগ নিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছেন।
ওই রিপোর্ট দেওয়ার সময় তিনি বলেন, “এই কার্ডের ধারণা অতি চমৎকার। একমাত্র সমস্যা হল এটির বাস্তবায়ন। এর প্রয়োগ করা হচ্ছে মারাত্মক ভাবে। আমার দুশ্চিন্তার কারণ হল পরিষেবার সঙ্গে আধার সংযুক্তিকরণ। আমাদের একে প্রতিহত করতে হবে।”
এক লক্ষ ৬৭ হাজার নাগরিকের উপরে এই সমীক্ষা করা হয়েছে। ২৮টি রাজ্যের ১,৪৭,৮৬৮ জনের উপরে ১০ মিনিটের এবং ১৬টি রাজ্যের ১৯,২০৯ জনের সঙ্গে ৪৫ মিনিটের কথোপকথনের উপরে ভিত্তি করে এই সমীক্ষা রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বে প্রাথমিক ডেটার এটাই সবচেয়ে বড় সংগ্রহ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সমীক্ষায় আরও একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গেছে। আধার কার্ডের গ্রাহকদের ৯২ শতাংশই এই কার্ড নিয়ে সন্তুষ্ট, আধার কার্ডের জন্য অন্তত একবার পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েও ৬৭ শতাংশ দাবি করেছেন, তাঁরা এই কার্ডের ব্যাপারে সন্তুষ্ট।
আধার ব্যবহারকারীরা এই কার্ডের মাধ্যমে নানা সুযোগসুবিধা ভোগ করছেন, যেমন রান্নার গ্যাসে ভর্তুকি (৯২ শতাংশ), পেনশন (৮৮ শতাংশ), মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ নিশ্চয়তা প্রকল্প বা ১০০ দিনের কাজ (৭৭ শতাংশ) ও আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প (৭৪ শতাংশ)।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজন, গৃহহীন ও বহু মহিলার এটাই প্রথম কোনও পরিচয়পত্র। এঁদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ মানুষ তাঁদের প্রথম ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য এই কার্ড ব্যবহার করেছেন আর এঁদের ৩৮ শতাংশ সিম কার্ড পেয়েছেন এই কার্ডের মাধ্যমেই।