দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ থেকে বছর আটেক আগে, কনকনে এক শীতের রাতে গোটা ভারতবর্ষ শুনেছিল নৃশংসতম ধর্ষণ ও খুনের একটি ঘটনা। সাক্ষী হয়েছিল, তরুণী ছাত্রীর সঙ্গে ঘটা এক অমানুষিক বর্বরতার। সে তরুণীর লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়ে দেশবাসী তাঁর নাম রেখেছিল
নির্ভয়া। যমে-মানুষে টানাটানির পরেও প্রাণে বাঁচেননি তিনি। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা হয়নি। কিন্তু মারা যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছিলেন মৃত্যুকালীন জবানবন্দি। সেই সঙ্গে বলে গিয়েছিলে, অপরাধীদের যেন সাজা হয়!
সেই নির্ভয়া গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পরে পেরিয়ে গেল প্রায় আটটা বছর। আজ, ২০ মার্চ ২০২০, ভোর সাড়ে পাঁচটায় শেষমেশ সাজা হল অপরাধীদের। ফাঁসির দড়িতে ঝুলল চার ধর্ষক ও খুনি। কিন্তু কীভাবে কেটেছে এই আটটা বছর? দোষীদের ফাঁসির দড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে ঠিক কতটা লড়াই করতে হয়েছে নির্ভয়ার পরিবারকে? আইনের কাছেই বা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল এই মামলা?
আসুন, এক ঝলকে দেখে নিই, কী কী ঘটেছে এই আটটা বছরে।
২০১২, ১৬ ডিসেম্বর
রাত ন’টা নাগাদ দিল্লির মুনিরকা থেকে বাসে উঠেছিলেন ২১ বছরের প্যারামেডিক্যাল ছাত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এক বন্ধু। 'লাইফ অফ পাই' সিনেমা দেখে, দ্বারকা ফিরছিলেন তাঁরা। সেই চলন্ত বাসেই ওই তরুণীকে গণধর্ষণ করেছিল ৬ জন। শুধু ধর্ষণ নয়, তরুণীর যোনিতে ঢোকানো হয়েছিল লোহার রড। যোনি ক্ষতবিক্ষত করে বাইরে বার করে আনা হয়েছিল অন্ত্র। এক বর্বরোচিত বিকৃতির পরিচয় দিয়েছিল অপরাধীরা। এর পরে বেধড়ক মারা হয় সঙ্গীকেও। সঙ্গীকে এবং অচৈতন্য, ছিন্নভিন্ন মেয়েটিকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দেয় তারা। পুলিশ উদ্ধার করে সফদরজঙ্গ হাসপাতালে ভর্তি করে তরুণীকে। তখনই নেওয়া হয় তাঁর প্রথম জবানবন্দি।আশঙ্কাজনক অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকেন তিনি।
২০১২, ১৭ ডিসেম্বর
নির্ভয়ার সঙ্গীর বয়ানের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হয় ছয় ধর্ষকের বিরুদ্ধে। এদিনই তাদের মধ্যে চার জনকে শনাক্ত করা হয়। গ্রেফতারও করা হয় এক অপরাধী, রাম সিংকে। ধর্ষণের অভিযোগ স্বীকার করে নেয় সে।
২০১২, ১৮ ডিসেম্বর
ধরা পড়ে ধর্ষণ কাণ্ডের আরও দুই অপরাধী। বিনয় শর্মা এবং পবন গুপ্ত। চতুর্থ অপরাধী মুকেশ সিং পালিয়েছিল রাজস্থানে, ধরে আনা হয় তাকেও।
২০১২, ২১ ডিসেম্বর
বিহারের ঔরঙ্গাবাদ থেকে ধরা পড়ে পঞ্চম অপরাধী অক্ষয়কুমার সিং ওরফে ঠাকুর। এদিনই ধরা পড়ে ষষ্ঠ ও শেষ অভিযুক্তও। নাবালক ছিল সে। তার নাম সামনে আসেনি পরবর্তীকালে।
২০১২, ২৫ ডিসেম্বর
আদালতে রুজু হয় নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা।
২০১২, ২৭ ডিসেম্বর
অবনতি হয় নির্ভয়ার শারীরিক অবস্থার। দিল্লি থেকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজ়াবেথ হাসপাতালে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নির্ভয়াকে।
২০১২, ২৯ ডিসেম্বর
চরম লড়াইয়ের পরে শেষ হয়ে যায় নির্ভয়ার লড়াই। মারা যায় সে। দোষীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলার সঙ্গে যোগ হয় খুনের অভিযোগও। সারা দেশ ফেটে পড়ে ক্ষোভে, রাগে। প্রতিবাদে পথে নামেন অসংখ্য মানুষ। বিক্ষোভ সামাল দিতে জলকামান চালাতে হয় পুলিশকে।
২০১৩, ৪ জানুয়ারি
পাঁচ অপরাধীর বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করা হয়। অপহরণ, গণধর্ষণ, খুনের চেষ্টা, খুন— একাধিক ধারায় রুজু হয় মামলা। দায়রা আদালতে প্রথম শুনানি হয়। তিহাড় জেলে পাঠানো হয় ৫ অপরাধীকে। ষষ্ঠ ও নাবালক অপরাধীর বিচার চলতে থাকে জুভেনাইল জাস্টিস কোর্টে।
২০১৩, ১১ মার্চ
তিহাড় জেলের ভিতরে আত্মহত্যা করে এক অভিযুক্ত রাম সিং।
২০১৩, ৩১ অগস্ট
নাবালক অপরাধীকে তিন বছরের জন্য জুভেনাইল কারাগারে পাঠানোর রায় দেয় আদালত।
২০১৩, ১০ সেপ্টেম্বর
একাধিক অপরাধে তিহাড় জেলের চার অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় দায়রা আদালত।
২০১৪, ১৩ মার্চ
দিল্লির আদালতে আবেদন করলে, আবেদন খারিজ করে ফাঁসির সাজা নিশ্চিত করা হয়।
২০১৪, ১৫ মার্চ
সুপ্রিম কোর্টে ফাঁসি মকুবের আর্জি জানায় অপরাধীরা। স্থগিতাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
২০১৫, ২০ ডিসেম্বর
জুভেনাইল কারাগার থেকে ছাড়া পায় নাবালক অপরাধী।
২০১৭, ৫ মে
সুপ্রিম কোর্টে ফের ওঠে নির্ভয়া-মামলা। ফের বহাল হয় ফাঁসির সাজা।
২০১৭, ৯ নভেম্বর
সুপ্রিম কোর্টে ফাঁসির সাজা পুনর্বিবেচনার আর্জি দায়ের করে অপরাধী মুকেশ সিং।
২০১৭, ১৫ ডিসেম্বর
আরও দুই অপরাধী পবন গুপ্ত এবং বিনয় শর্মাও দায়ের করে ফাঁসির সাজা পুনর্বিবেচনার আবেদন।
২০১৮, ৯ জুলাই
তাদের ফাঁসির সাজা রদের পুনর্বিবেচনার আর্জি খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট।
২০১৯, ২৯ অক্টোবর
তিহাড় জেল কর্তৃপক্ষ অপরাধীদের জানায়, প্রাণভিক্ষার আর্জি জানানোর জন্য আর মাত্র সাত দিন সময় আছে।
২০১৯, ৮ নভেম্বর
রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছে প্রাণভিক্ষার আর্জি জানায় বিনয় শর্মা।
২০১৯, ১ ডিসেম্বর
দিল্লি সরকার বিনয় শর্মার প্রাণভিক্ষার আর্জি খারিজ করার কথা বলে।
২০১৯, ১০ ডিসেম্বর
অক্ষয়কুমার সিং সুপ্রিম কোর্টে ফাঁসির সাজা মকুবের আবেদন জানায়।
২০১৯, ১৩ ডিসেম্বর
অপরাধীর আর্জির বিরোধিতা করে আদালতে যান নির্ভয়ার মা আশাদেবী।
২০১৯, ১৮ ডিসেম্বর
অক্ষয়কুমারের আবেদনও খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট।
২০২০, ৭ জানুয়ারি
দিল্লির পাতিয়ালা হাউস আদালত রায় দেয়, ২২ জানুয়ারি সকাল সাতটায় তিহাড় জেলে ফাঁসি হবে চার অপরাধীর।
২০২০, ১৩ জানুয়ারি
তিহাড় জেলে অনুষ্ঠিত হয় নকল ফাঁসির মহড়া।
২০২০, ১৪ জানুয়ারি
বিনয়, মুকেশের ফাঁসি রদের আর্জি শুনল সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ। পত্রপাঠ খারিজ হয়ে যায় আবেদন। এর পরে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আর্জি জানাল মুকেশ সিং।
২০২০, ১৫ জানুয়ারি
বারবার আর্জির কারণে পিছিয়ে গেল নির্ভয়া-অপরাধীদের ফাঁসির তারিখ।
২০২০, ১৭ জানুয়ারি
মুকেশ সিং-এর প্রাণভিক্ষার আর্জি খারিজ করলেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। এদিনই ফাঁসির নতুন তারিখ ঘোষণা করল দিল্লি আদালত। ১ ফেব্রুয়ারি।
২০২০, ২০ জানুয়ারি
অপরাধ ঘটানোর সময় নাবালক ছিল বলে ফের আদালতে প্রাণভিক্ষার আর্জি জানায় পবন গুপ্ত। বিরক্তি-সহ খারিজ করে আদালত।
২০২০, ২৬ জানুয়ারি
রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষার আর্জি খারিজের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে নির্ভয়ার ধর্ষক মুকেশ।
২০২০, ২৯ জানুয়ারি
কিউরেটিভ পিটিশন দায়ের অক্ষয়ের।
২০২০, ৩০ জানুয়ারি
অপরাধী বিনয় শর্মার দাবি, জেলে অকথ্য অত্যাচার চলেছে, এর মধ্যেই অনেকবার 'মরে গেছে' সে। তাই যেন রদ করা হয় ফাঁসি। খারিজ হয়ে যায় সে আবেদন। তিহাড় জেলে এসে পৌঁছন ফাঁসুড়ে
পবন।
২০২০, ৩১ জানুয়ারি
ফাঁসি পিছিয়ে গেল নির্ভয়া অপরাধীদের।
২০২০, ৫ ফেব্রুয়ারি
ফের নতুন তারিখ ঠিক হল ফাঁসির। ২০ ফেব্রুয়ারি হবে ফাঁসি।
২০২০, ৭ ফেব্রুয়ারি
আবারও পিছিয়ে গেল ফাঁসি। বলা হয়, এখনও কিছু আইনি আবেদনের জায়গা বাকি রয়েছে নির্ভয়ার দোষীদের। সে সব মিটিয়ে নিয়েই তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।
২০২০, ১৭ ফেব্রুয়ারি
ঘোষণা হয়, আগামী ৩ মার্চ নির্ভয়া মামলার চার আসামীকে ফাঁসি দেওয়া হবে।

২০২০, ২৮ফেব্রুয়ারি
ফাঁসির চারদিন আগে সুপ্রিম কোর্টে ফের আবেদন নির্ভয়া কেসের আসামী পবন গুপ্তর। এর আগেই অবশ্য একাধিক বার আবেদন করেছে মুকেশ কুমার সিং, বিনয় কুমার শর্মা ও অক্ষয় কুমার। তাদের পক্ষে আর কোনও ভাবেই ফাঁসি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়।
২০২০, ২ মার্চ
পবনের আবেদন খারিজ হল, সেই সঙ্গে ফের পিছিয়ে গেল ফাঁসি। এই নিয়ে তিন বার। এই বার পিছোনোর কারণ, শেষতম আবেদন ও ফাঁসির তারিখের মাঝে ১৪ দিন সময় থাকা বাধ্যতামূলক।
২০২০, ৪ মার্চ
নির্ভয়া-দোষীদের হাতে আর কোনও সুযোগ নেই, ফাঁসির নতুন তারিখ চাইল তিহাড়।
২০২০, ৫ মার্চ
২০ মার্চ ফাঁসি হবে, ঘোষণা করল আদালত।
২০২০, ৯ মার্চ
ফাঁসি এড়াতে ফের আবেদন, এবার দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নরের দ্বারস্থ বিনয়।
২০২০, ১১ মার্চ
হাত মুচকে দেওয়ালে মাথা ঠুকে দিয়েছে, পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআরের আর্জি দোষী পবনের।
২০২০, ১৬ মার্চ
রাষ্ট্রপতির কাছে নিষ্কৃতি-মৃত্যুর আর্জি চার আসামির পরিবারের। এসবে কর্ণপাত না করে শেষ আর্জিও খারিজ করল সুপ্রিম কোর্ট। নির্ভয়া-অপরাধীরা এবার আন্তর্জাতিক আদালতে! ফাঁসি পিছোতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ।
২০২০, ১৭ মার্চ
ঘটনার দিন দিল্লিতে ছিলাম না, নতুন পিটিশনে দাবি দোষী মুকেশের। বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করলেন অক্ষয় ঠাকুরের স্ত্রী।

২০২০, ১৮ মার্চ
ফাঁসির ২ দিন আগে ফের আদালতে নির্ভয়া দোষীরা। দোষীদের আইনজীবী এপি সিং নতুন পিটিশন দাখিল করলেন। পবন গুপ্তর তরফে একটি কিউরেটিভ পিটিশন সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হল। এবং অক্ষয় ঠাকুরের তরফে রাষ্ট্রপতির কাছে দ্বিতীয়বার প্রাণভিক্ষার আর্জি জানানো হল।
২০২০, ১৯ মার্চ
নির্ভয়ার চার দোষী মুকেশ সিং, পবন গুপ্ত, বিনয় শর্মা ও অক্ষয় ঠাকুরের আর কোনও আবেদন বাকি নেই বলেই জানিয়ে দিল দিল্লি আদালত। নিজেদের ফাঁসি রুখতে আর কোনওভাবেই আদালতের কাছে আবেদন করতে পারবে না তারা।
২০২০, ২০ মার্চ, রাত ১২টা-৪টে
ফাঁসির কয়েক ঘণ্টা আগে, মধ্যরাতে শুরু হল মহানাটক! একের পরে এক আবেদন জানালেন অপরাধী পক্ষের আইনজীবী এপি সিং।
দেখে নিন সেই পর্বের লাইভ আপডেট।
২০২০, ২০ মার্চ, ভোর ৪টে
লক করে দেওয়া হল তিহাড় জেল। শুরু হল ফাঁসির প্রস্তুতি। অপরাধীদের ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল স্নান করানোর জন্য।
২০২০, ২০ মার্চ, ভোর ৫:৩০
ফাঁসি হল নির্ভয়া গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার চার অপরাধী পবন গুপ্ত, মুকেশ সিং, অক্ষয় ঠাকুর ও বিনয় শর্মার।
প্রায় আট বছর ধরে লড়াই চালানোর পরে মিলল বিচার। সার্থক হল নির্ভয়ার মায়ের দাঁতে দাঁত চাপা লড়াই। শান্তি পেল নির্ভয়ার আত্মা, স্বস্তি পেল গোটা দেশ।