
শেষ আপডেট: 28 July 2023 05:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত কয়েক দশকে ছোটবেলা থেকে বাংলা পরীক্ষার খাতায় একটি রচনা প্রায় সকলেই কোনও না কোনও সময়ে লিখেছেন-- বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ। এবার যেন তেমনই একটা বিষয় নিত্যদিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে মানবসভ্যতাকে। ইন্টারনেট আশীর্বাদ না অভিশাপ! এই প্রযুক্তির কল্যাণে যেমন গোটা বিশ্ব হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, তেমনই হাজারও বিপদের ফাঁদ রোজ বাড়ছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার জায়গায় পৌঁছচ্ছে ছোট ছেলেমেয়েদের অবাধে আনাগোনা ইন্টারনেট দুনিয়ায়।
এখন নানা কারণেই খুব ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ইন্টারনেটের জগতে প্রবেশ করতে দেন বাবা-মায়েরা। কিন্তু সঠিক নজরদারি করতে বা ইন্টারনেট জগতের বিপদ (dark web) থেকে তাদের বাঁচাতে অনেকেই পারেন না। এমনই এক ঘটনা ঘটে গেছে নেদারল্যান্ডসের বারবারা জেমেন নামে একজন মহিলার ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর আট বছরের ছেলের সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মর্মান্তিক কাহিনি শেয়ার করেছেন। জানিয়েছেন তাঁর অজান্তেই ছেলে হ্যাকিং করতে শিখে গিয়েছিল এবং লুকিয়ে ডার্ক ওয়েব থেকে অর্ডার করে ফেলেছিল আস্ত একটি একে-৪৭ রাইফেল (8-year-old ordered AK-47)!
ইউরোনিউজ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বারবারর সাক্ষাৎকার বলছে, তাঁর ছেলে খুব ছোট থেকেই কম্পিউটারের পোকা ছিল। সারাদিনের অনেকটা সময় সে কম্পিউটার ঘেঁটেই কাটাত। ইন্টারনেট জগতে তার ছিল অবাধ আনাগোনা (dark web)। প্রথম দিকে বারবার 'চাইল্ড লক' জাতীয় নানা প্রযুক্তির সাহায্য নিলেও, তাঁর ছেলে এসব অনায়াসে ভেঙে ফেলেছিল এবং খুব অল্প বয়সে হ্যাকিং করতেও শুরু করেছিল। শুধু তাই নয়, এর পরে শুরু হয় অসৎ পথে অনলাইনে জিনিস অর্ডার করা, পয়সা ছাড়াই। প্রথমদিকে, বার্গার-পিৎজার মতো এসব নানা ছোট জিনিস ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে।
বারবারা জানান, ছেলে যে ইন্টারনেট জগতে নিছক চলাচল করছে না, কোনও গোপন বিষয়ে জড়িয়ে পড়ছে, তা তাঁর সন্দেহ হতে শুরু করে ধীরে ধীরে। কখনও কখনও তিনি ছেলের ঘরে ঢুকে পড়লেই অনলাইন গেমে ছেলে বলে উঠত, 'পিট আসছে, সাবধান!' যেন মায়ের এসে যাওয়া নিয়ে কাউকে সাবধান করার চেষ্টা করত কোড ল্যাঙ্গুয়েজে। তখনও বারবারা ভাবতে পারেননি, কী ঘটাতে চলেছে ছেলে।
সন্তান ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বেশি সময় কাটাচ্ছে, মোবাইল-ল্যাপটপে কী দেখছে খোঁজখবর রাখছেন তো
এর মধ্যেই একদিন বাড়িতে ডেলিভারি হয় একটি একে-৪৭ রাইফেল! তখনই প্রবল চমকে যান তিনি। শুধু তাই নয়, তিনি জানতে পারেন, ছেলে চোরাপথে আনিয়েছে বন্দুকটি। সেটা পোল্যান্ড থেকে বুলগেরিয়া এসেছে এমন পথে, যাতে নিরাপত্তা পরীক্ষায় ধরা না পড়ে। সব দেখেশুনে বারবারা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন এবং অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি স্থানীয় পুলিশকে সব জানিয়ে বন্দুকটি হস্তান্তর করেন। কিন্তু সে সময়ে তার ছেলের বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে এখানেই বিষয়টি মেটেনি, বারবারা ছেলের আচরণে বড়সড় পরিবর্তন লক্ষ্য করতে থাকেন। খোঁজখবর নিয়ে বোঝেন, হ্যাকারদের একটি আন্তর্জাতিক গ্রুপের সঙ্গে সারারাত জেগে জেগে কাজ করে তাঁর ছেলে! এই সময়ে ফের প্রশাসন ও পুলিশের সাহায্য চান তিনি। আইনের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ছেলের বয়স এতই ছোট, সবাই তাঁর উদ্বেগকে 'বাড়াবাড়ি' বলে উড়িয়ে দেন।
বারবারা অবশ্য হাল ছাড়েননি। তিনি নিজেই সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে লেখাপড়া শুরু করেন, এই নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। একসময় এখন ডাচ পুলিশের সঙ্গে সাইবার সেলের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর পরেই অনেক তথ্য আসে বারবারার হাতে এবং তিনি অবাক হয়ে যান, ল্যাপটপ, মোবাইল, কম্পিউটার ব্যবহার করে কত সহজে হ্যাকিংয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বাচ্চারা! তারা যেহেতু জানেই না কোনটা বৈধ আর কোনটা বেআইনি, তাই তাদের দিয়ে সহজেই অনেক কুকর্ম করিয়ে নিচ্ছে ডার্ক ওয়েবের অপরাধীরা।
শেষমেশ অনেক লড়াই করে ছেলেকে এই জগত থেকে মুক্ত করতে পেরেছেন তিনি।
তথ্য বলছে, কোভিড এবং তার পরবর্তী সময়ে অনলাইন দুনিয়ায় আসক্তি অনেকটাই বেড়েছে। এখন আর বাচ্চারা বেশি রাস্তায় বেরিয়ে খেলাধূলা করে না। সারাক্ষণ হাতে মোবাইল নিয়ে নেট দুনিয়ায় মজে থাকে। দেখা যায়, বাবা-মায়েরাও বাচ্চাদের শান্ত রাখার জন্য হাতে মোবাইল বা ট্যাব ধরিয়ে দিচ্ছেন।
এ কথা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই যে আমাদের জীবনে অপরিহার্য জিনিসের তালিকায় ক্রমশ ঢুকে পড়ছে ইন্টারনেট। তা কাজের তো বটেই, বিনোদন আর অবসরযাপনের মাধ্যমও। আর সেখানেই হচ্ছে গলদটা। বড়রাই কত ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছেন – ছোটোদের ভুল হওয়ার আশঙ্কা আরও বেশি। ফেক অ্যাকাউন্ট, সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স, মহিলাদের প্রতি ঘৃণ্য মনোভাব, কাউকে অপছন্দ হলে তাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা – একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয় কাজ করে। ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে সন্তান এইসব শিখে নিচ্ছে কিনা তার খোঁজ রাখতেই হবে।
নেদারল্যান্ডসের বারবারা চরম বিপদ ঘটে যাওয়ার আগেই থামাতে পেরেছেন সন্তানকে। অনেকেই পারেন না। তার ফলও মেলে আকছার। প্রায়ই দেশের নানা প্রান্ত থেকে খবর আসে, অনলাইন বিপদে সন্তানদের জীবন নষ্ট হওয়ার। সচেতনতা ও নজরদারিই একমাত্র উপায়।
মৃত্যুর চার বছর পর বাবার হৃদস্পন্দন শুনতে পান মেয়েরা! কীভাবে সম্ভব