
শেষ আপডেট: 2 December 2020 14:30

মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠে ভোপাল।
ভোপালের জনবসতির মধ্যেই ছিল ইউনিয়ন কার্বাইড-এর ওই রাসায়নিক কারখানা। সেখানে তৈরি ও সঞ্চিত হত বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট। ২ ডিসেম্বরের রাতে কারখানার ‘সি প্ল্যান্ট’-এ সঞ্চিত মিথাইল আইসোসায়ানেটের ৬১০ নম্বর ট্যাঙ্কে কোনও ভাবে জল মিশে যায়। এরপরে জল ও গ্যাসের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য গ্যাস। ভয়ঙ্কর তাপ ও চাপে ট্যাঙ্ক খুলে প্রায় ৪০ মেট্রিক টন মারণ মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ ওই বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়েন। প্রাণ হারান হাজারে হাজারে মানুষ। শুধু একদিনের জন্য নয়, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রেখে যায় মারাত্মক রোগব্যাধির অভিশাপ।
এই সেই রাসায়নিক কারখানা।
প্রথমে কারখানা এলাকার বস্তিবাসীদের নাকে আসে দুর্গন্ধ। চোখ জ্বলতে শুরু করে। ক্রমশ গন্ধ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট শুরু হয়। অনেকে বমি করতে শুরু করে। হাজারে হাজারে মানুষ কিছুই বুঝতে না পেরে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। কারখানায় বিপদসংকেত সাইরেন বেজে ওঠার পরে বোঝা যায় গ্যাস লিক করছে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ঘন গ্যাসের ধোঁয়ায় রাস্তা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না, তার মধ্যেই ছুটছে মানুষ। সকলেই উদভ্রান্ত। দিশেহারা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভোপাল শহর মৃত্যুনগরীতে পরিণত হয়। হাসপাতালে তিন ঠাঁই নেই। শ্বাসকষ্ট, চোখ ও ত্বকে জ্বালায় মানুষ ছটফট করতে থাকে৷ চিকিৎসকরাও প্রথমে বুঝে উঠতে পারেননি এই রোগের চিকিৎসা কী হবে? এদিকে সকাল হতেই শহর জুড়ে শুধু লাশ আর লাশ। হাসপাতালের ছবিটাও ছিল প্রায় একই।
আজও অভিষাপ বয়ে বেড়াচ্ছে ভোপাল।
মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভোপাল গ্যাসকাণ্ডে মোট মৃতের সংখ্যা ৩৭৮৭ জন। শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন ৫ লাখ ৫৮ হাজার ১২৫ জন। স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন ৩,৯০০ জন। যদিও বেসরকারি হিসাবে ওই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের বেশি। সরকারের তরফ থেকে দূর্ঘটনায় মৃত ও আহতদের পরিবারকে মোট ৭১৫ কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়৷ ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেডের মারণ গ্যাস থেকে রেহাই পায়নি গর্ভস্থ সন্তানও। গর্ভেই ৪৩ শতাংশ নারীর সন্তান মারা যায়। ঘটে গর্ভপাতও। ১৪ শতাংশের মৃত্যু ঘটে জন্মের এক মাসের মধ্যে। শুধু মানুষ নয়, মারা যায় হাজার হাজার পশুপাখি, গাছ। জলও হয়ে যায় দূষিত।
পরিত্যক্ত কারখানা।
এত বড় বিপর্যয় হলেও ইউনিয়ন কার্বাইডের কোনও শীর্ষ কর্তাব্যক্তিকে বিচারের কাঠগড়ায় তোলা যায় নি। সংস্থার তৎকালীন চেয়ারম্যান ওয়ারেন অ্যান্ডারসন গ্রেফতার হয়েছিলেন কিন্তু জামিনও পেয়ে যান। এর পরেই তড়িঘড়ি ভারত ত্যাগ করেন। ভারত সরকার তাঁকে 'ফেরার' ঘোষণা করে। কিন্তু আর ধরা যায়নি। ২০১৪ সালে অ্যান্ডারসনের মৃত্যু হয়। বিপর্যয়ের তদন্তে নেমে দেখা যায়, বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে উদাসীনতা আর অসতর্কতা এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। যেমন, ছোট ছোট ড্রামের বদলে রাসায়নিক রাখা হত বড় বড় ট্যাঙ্কে। ক্ষয়ে যাচ্ছিল পাইপলাইনও। ঘাটতি ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিপর্যয় মোকাবিলার পরিচালন ব্যবস্থাতেও। ইউনিয়ন কার্বাইডের কারখানা এখন পরিত্যক্ত। মধ্যপ্রদেশের সরকার ১৯৯৮ সালে এই কারখানার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।