দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশাখাপত্তনমের রাসায়নিক কারখানায় গ্যাস লিক করে ১১ জনের মৃত্যুর ঘটনাটি নতুন করে উস্কে দিয়েছে ৩৬ বছর আগের এমনই এক মর্মান্তিক দিনের কথা। ১৯৮৪ সালের ২ রা ডিসেম্বর। ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইড গ্যস লিমিটেড কারখানা থেকে বিষাক্ত গ্যাস লিক করে মারা যান হাজারের বেশি মানুষ। ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছিলেন যাঁরা, গোটা জীবন তাঁদের ভুগে যেতে হয়েছে নানান সমস্যায়।
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যায়, ভোপালের ইব্রাহিমগঞ্জে সেদিন আশ্চর্যজনক ভাবে বেঁচে গেছিলেন কিছু মানুষ। সেদিন হয়তো ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু দুর্ঘটনার এত দিন পরে তাঁদের প্রায় সকলেই মারা গেলেন কোভিড ১৯-এ। আর এই মৃত্যুর পেছনে পরোক্ষে দায়ী থেকে গেল সেই সেই গ্যাস দুর্ঘটনা। কারণ বিষের প্রভাবে তাঁরা নানা দুরারোগ্য অসুখে ভুগছিলেন এত বছর ধরে, দুর্বল হয়ে গেছিল প্রতিরোধ ক্ষমতা। তাই সহজে সংক্রামিত হয়েছেন কোভিডে। সঙ্গে জুড়েছে কো-মর্বিডিটি। প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনা।
১৯৮৪ সালে ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইড গ্যাস লিমিটেড থেকে বের হওয়া বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট লিক করার সেই দুঃসহ স্মৃতি অনেকের মনেই এখনও টাটকা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভোপাল গ্যাসকাণ্ডে মোট মৃতের সংখ্যা ৩৭৮৭ জন। শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন ৫ লাখ ৫৮ হাজার ১২৫ জন। স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন ৩,৯০০ জন। যদিও বেসরকারি হিসাবে ওই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের বেশি। প্রাণে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলির প্রত্যেকের নানা দুরারোগ্য রোগ দেখা গেছে পরবর্তী কালে। সেই ক্ষতকে নতুন করে মনে করাচ্ছে এলজি পলিমারস।
তার উপরে দেশজুড়ে এখন করোনা মহামারীর আতঙ্ক। তারই মাঝে বিশাখাপত্তনমের ঘটনা রীতিমতো চিন্তার। সেই চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিল ভোপালের ইব্রাহিমগঞ্জে মারা যাওয়া ১০ কোভিড-১৯ আক্রান্ত। এঁরা প্রত্যেকেই ৩৬ বছর আগের গ্যাস দুর্ঘটনা থেকে কোনও মতে বেঁচে ফিরেছিলেন।
ইব্রাহিমগঞ্জের বাসিন্দা নরেশ খাটিকের তখন বয়স ছিল ১৬। কোনও মতে প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলেন সেদিনের কিশোর। কিন্তু এই বার এপ্রিলের শুরুতে করোনা সংক্রমণে মারা যান ৫২ বছরের নরেশ। ওই অঞ্চলে যত জন কোভিড ১৯-এ মারা গেছেন তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি ভোপাল গ্যাসকাণ্ডে রক্ষা পাওয়া মানুষ।
চিকিৎসকরা বারবারই বলেছেন, যাদের ফুসফুসে বা হৃদযন্ত্রের সমস্যা আছে করোনা তাঁদের জন্য ভয়াবহ। ঠিক সেটাই ঘটল। মিথাইল আইসোসায়ানেটের আক্রমণ থেকে সেদিন বেঁচে গেলেও এঁদের সকলের ফুসফুস এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যা ছিল। তাই এবারের লড়াইটা জেতা হল না। মৃতদের পরিবারের লোকজন চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ এনেছে। তাঁদের দাবি, রোগের উপসর্গ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অনেক জায়গায় ফেরত পাঠানো হয় তাঁদের।
প্রসঙ্গত, ভোপালের সেদিনের দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে যান তাঁদের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভোগেন। করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে এঁরা বিপদসীমার কাছাকাছি। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ মেনে ইউনিয়ন কার্বাইডের পক্ষ থেকেই ভূপাল মেমোরিয়াল হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার খোলা হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। সেখানে এঁদের সকলের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। আরও বেশ কিছু সরকারি হাসপাতালও আছে এই মানুষগুলির জন্য। কিন্তু সব ক'টির আউটডোর পরিষেবা এখন বন্ধ।
মৃত নরেশ খাটিকের ছেলে জানান, তাঁর বাবা যেদিন অসুস্থ হন সেদিন তিনি তিনটি হাসপাতাল ঘুরেছিলেন। কেউ ভর্তি নেয়নি। শেষে ১৫ হাজার টাকা খরচ করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। একই রকম অভিযোগ এনেছেন মহম্মদ অউসাফ, আমন যাদব কিংবা রিয়াজুদ্দিনদের পরিবারের লোকজন। সকলেই ইউনিয়ন কার্বাইড কাণ্ড থেকে বেঁচেছিলেন। মারা গেলেন কোভিড- ১৯ এ। এঁদের সকলেরও ফুসফুস কিংবা হৃদযন্ত্রের সমস্যা ছিল।
যদিও ভোপালের প্রধান স্বাস্থ্যকর্তা প্রভাকর তিওয়ারী বলেন, ওই ব্যক্তিরা যে চিকিৎসার গাফিলতিতে মারা গিয়েছেন তা ঠিক নয়। বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাঁরা এমনিতেই বিপদসীমার কাছাকাছি ছিলেন, তাই দ্রুত সংক্রামিত হয়েছেন। সময়মতো হাসপাতালে আনতে পারেননি বাড়ির লোক, এমনটাই তিনি মনে করছেন।
ফলে সবমিলিয়ে এই পরিস্থিতিতে আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে অত বছর আগে গ্যাস দুর্ঘটনায় রক্ষা পেলেও এই করোনা থেকে কতটা বাঁটবেন তাঁরা। এই বিপদে কি বিশাপত্তনমে গ্যাস আক্রান্ত মানুষরাও পড়তে পারেন! সময়ই বলতে পারবে এই প্রশ্নের উত্তর।