দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু'মাসেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকার পরে অবশেষে খোঁজ মিলল চিনের উহান শহরের সাংবাদিক লি জেহুয়ার। ঘটনাচক্রে, উহানে ছড়িয়ে পড়া মারণভাইরাসের খবর যে সাংবাদিকরা সবার আগে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন, জেহুয়া তাঁদের মধ্যে একজন। করোনার জেরে উহানের কী অবস্থা হয়েছে, সে ছবি তুলে ধরেছিলেন বিশ্বের সামনে। অভিযোগ ওঠে, এই কাজ করার 'অপরাধে'ই সরকারপক্ষের রোষানলে পড়েন তিনি। এর পরে আচমকাই নিখোঁজ হয়ে যান লি। শেষমেশ খোঁজ মিলল তাঁর। তিনি দাবি করেছেন, এতদিন কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন তিনি।
২৬ ফেব্রুয়ারি তবে নিখোঁজ হওয়ার আগে লি জানিয়েছিলেন, করোনার খবর প্রকাশ করার পর থেকেই একটা সাদা রঙের এসইউভি তাঁকে ফলো করে। জেহুয়া যেখানেই যান সেখানেই ওই সাদা গাড়ি দেখতে পান। গাড়িটি পুলিশের গাড়ি বলে সন্দেহ করেছিলেন তিনি। এর পরেই কার্যত উধাও হয়ে যান লি। দু'মাস পরে খোঁজ মিলল তাঁর। তিনি নিজেই জানালেন, হুবেই প্রদেশের কোনও এক জায়গা থেকে তাঁকে আটক করা হয়েছিল।
এর পরে উহানেই কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন তিনি। স্পর্শকাতর অঞ্চলে ঘোরাফেরা করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন তাঁকে ঘরে থাকতে বলেছিল বলে জানান তিনি। যদিও জেহুয়ার দেওয়া এই তথ্য সম্পূর্ণ সত্যি নয় বলে দাবি করেছে চিনা সংবাদমাধ্যমের একাংশ। তাদের অভিযোগ, চাপে পড়েই জেহুয়াকে এসব বলতে হচ্ছে।
তবে লি জেহুয়া একা নন। চেন কিউশি নামে আরও এক সাংবাদিক নিখোঁজ উহানে। জানা গেছে, উহানের একটি জায়গার ভিডিও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন চেন, যেখানে দেখা গেছে বহু লাশ পোড়ানো হচ্ছে। এর পরেই সাংবাদিক চেন নিখোঁজ হয়ে যান। তারও পেরিয়ে গেল ৭৫ দিন। নিখোঁজ হওয়ার আগে একটি ভিডিও বার্তায় কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি, বলে ছিলেন, "খুব ভয় করছে"। ফ্যাং বিন নামের আরও এক সাংবাদিকেরও হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না উহানে।
[caption id="" align="alignnone" width="1280"]

চেন কিউশি। নিখোঁজ হওয়ার আগে একটি ভিডিও বার্তায় কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি, বলে ছিলেন, "খুব ভয় করছে"।[/caption]
লি জেহুয়া নিখোঁজ হওয়ার আগে যখন বিভিন্ন বিষয়ে রিপোর্টিং করেছেন, তখন তিনি বলেছিলেন, "আমি উহানে ঢোকার আগেই আমায় সাবধান করেছিলেন অনেকে। চিনের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কাজ করে আমার একজন বন্ধু, সে আমায় বলেছিল এই মহামারী নিয়ে সব খারাপ খবরই চিনের সরকার একা সংগ্রহ করছে। কাউকে করতে দিচ্ছে না। শুধু রোগীদের সেরে ওঠা নিয়ে ভাল খবর করতে পারব আমরা। কিন্তু সেটা করতে গিয়েও, রোগীদের আরোগ্যের বিষয়টা কতটা সত্যি তা নিয়ে সন্দেহ ছিল আমার। আমি অন্য খবর পাচ্ছিলাম।"
[caption id="" align="alignnone" width="976"]

নিখোঁজ আরও এক সাংবাদিক ফ্যাং বিন।[/caption]
সেই সময়ে লি জেহুয়ার রিপোর্ট করা খবরে সংক্রমণের কথা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। শেষকৃত্যের জায়গায় উপচে পড়া ভিড়ের অভিযোগ ছিল। চিনের বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ও তা থেকে পরে ইউটিউবে এবং টুইটারে লক্ষ লক্ষ বার এইসব ভিডিও মানুষ দেখেছে, শেয়ার করেছে।
এর পরেই ২৫ বছরের লি জেহুয়ার আরও একটি লাইভ ভিডিও সামনে আসে। তাতে তিনি বলেন, তিনি যখন উহানে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আর একটি গাড়ি থেকে তাঁকে থামতে বলা হয়। কিন্তু না থেমে লি জোরে গাড়ি চালিয়ে চলে যান। তিনি বলছেন তিনি 'বিভ্রান্ত' ছিলেন এবং 'ভয়' পেয়েছিলেন। ৩০ কিলোমিটার পথ তাঁকে অন্য গাড়িটি ফলো করে। বাড়ি ফিরেই গোটা ঘটনাটি লাইভ করেন তিনি।
[caption id="" align="alignnone" width="512"]

গাড়ি নিয়ে পালানোর সময়ে লাইভ ভিডিও করেছিলেন লি।[/caption]
এর পরে আর খোঁজ মেলেনি লি-এর।
দু'মাস পরে এখন ফের আত্মপ্রকাশ করেছেন তিনি। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে জানান, তিনি ঘরে পৌঁছনোর কিছুক্ষণ পরেই পুলিশকর্মীরা এসে ঘিরে ফেলে তাঁর বাড়ি। তিনি ঘরের আলো নিভিয়ে দেন এবং নিঃশব্দে বসে থাকেন। শুনতে পান, পুলিশ অফিসাররা অন্য বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ছে। শেষ পর্যন্ত তিন ঘণ্টা পরে তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে তাঁর আঙুলের ছাপ আর রক্তের নমুনা নেয়া হয়। তারপর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বলা হয়, তাঁকে কোনও শাস্তি দেওয়া হবে না, কিন্তু কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। লি জেহুয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় উহানের সরকারি কোয়ারেন্টাইন আবাসনে। সেখানে তাঁর ফোন, ল্যাপটপ-- সব নিয়ে নেওয়া হয়।
লি দাবি করেছেন, দু'সপ্তাহ সেখানে নিরাপদেই ছিলেন তিনি। টিভিও দেখছিলেন ইচ্ছে হলে। দু'সপ্তাহ পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য একটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে। আরও দু'সপ্তাহ থাকার পরে বাড়ি ফিরতে দেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু তিনি আরও একমাস ইচ্ছে করেই বাড়িতে বন্দি ছিলেন, কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করে।
এই কথাটাই অবাক করছে সকলকে। বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েও লি জানালেন না, তাঁর অবস্থা এবং অবস্থান! 'নিখোঁজ' হয়েই থেকে গেলেন? এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য!

লি অবশ্য বলেছেন, "এই গোটা সময়টায় পুলিশ কোনও রকম নির্যাতন না করে, আইন মেনেই আমার সঙ্গে আচরণ করে। আমার বিশ্রাম ও খাওয়াদাওয়ার ওপর নজর রাখে। আমার দেখাশোনা করে বেশ ভাল ভাবে কোয়ারেন্টাইন শেষ করে আমি পরিবারের লোকেদের কাছে ফিরে যাই। যাঁরা আমার দেখাশোনা করেছেন তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি যারা মহামারীতে আক্রান্তরা সেরে উঠবেন। চিনের মঙ্গল হোক।"
অনেকেই বলছেন, এটা লি-এর সাজানো বয়ান। হয়তো এমন কিছু ঘটেছে তাঁর সঙ্গে, বা এমন কোনও হুমকি দেওয়া হয়েছে, যে এই মুহূর্তে সত্যিটা বলতে পারছেন না লি।
অন্য দিকে লি-এর খোঁজ মিললেও সাংবাদিক চেন কিউশি ৭৫ দিন পরে এখনও নিখোঁজ। ফেব্রুয়ারির পর থেকে আর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না ফ্যাং বিং নামের আর এক সাংবাদিকেরও। ঘটনাচক্রে, সকলেই চিনের সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন করোনা মহামারী বিষয়ে।