
শেষ আপডেট: 24 August 2018 18:30

কলকাতার নামী ট্রাভেল এজেন্সি ‘কুণ্ডু স্পেশাল’-এর তরফ থেকে আশিস বিশ্বাস জানালেন, অগস্ট ২০ তারিখে তাঁদের কেরল ও কন্যাকুমারী ট্যুরের যে বুকিং ছিল সেটা ক্যানসেল হয়েছে বটে, তবে সেপ্টেম্বর ১০ তারিখের বুকিং একেবারে ‘ফুল’। সব ক’টি ট্যুরেই ভর্তি হয়ে গিয়েছে যাত্রীসংখ্যা। পরবর্তী ট্যুরের তারিখ রয়েছে অক্টোবর ৮ থেকে। সেখানেও বুকিং হয়েছে বিস্তর। পুজো উপলক্ষ্যে আগে থেকেই বুকিং সেরে রেখেছেন সবাই এবং আশ্চর্যের বিষয় হল বন্যা পরিস্থিতির নিত্য নতুন খবর পাওয়া সত্ত্বেও সেই বুকিং ক্যানসেল করেননি কোনও যাত্রীই।
‘কুণ্ডু স্পেশাল’-এর তরফে বরুণ ঘোষ ‘দ্য ওয়াল’কে বললেন, ‘‘হোয়াটস্অ্যাপ করে কোনও কোনও যাত্রী সামান্য অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন বটে, তবে বুকিং ক্যানসেল করতে রাজি নয় কেউই।’’ ট্রাভেল এজেন্সির তরফ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে কেরলের হোটেল, লজগুলির সঙ্গেও। তাদের তরফ থেকেও গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন বরুণবাবু। তাঁর দাবি, পুজো অনেক দেরি, সুতরাং ততদিনে ক্ষত অনেকটাই সারিয়ে ফেলবে কেরল। তাই ভ্রমণে বাধা পড়বে বলে মনে হয়না।
তবে, বন্যা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে সেপ্টেম্বরের সমস্ত বুকিং ইতিমধ্যেই ক্যানসেল করে যাত্রীদের টাকা ফিরিয়ে দিয়েছে ‘ব্যানার্জি স্পেশাল’। এই ট্রাভেল এজেন্সির তরফে মৃদুল বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের ট্যুর বাতিল হলেও অক্টোবরের ৩টি, নভেম্বরের ২টি এবং ডিসেম্বরের ৪টি ট্যুরের বেশিরভাগই ভর্তি। সেপ্টেম্বরের পর পরবর্তী ট্যুরের তারিখ অক্টোবর ১২। সেখানে বুকিং পুরো ভর্তি। এমনকি বহু মানুষ এখনও ফোন করে আগাম বুকিংয়ের জন্য তথ্য সংগ্রহ করছেন বলেও জানালেন তিনি।
খোঁজ করা হয়েছিল ‘ডলফিন ট্রাভেলস’ এবং ‘যাত্রিক ট্রাভেলস’-এও। সবারই এক মত। অক্টোবর ১৫ থেকে কেরল এবং কন্যাকুমারী ভ্রমণের বুকিং রয়েছে পুরোমাত্রায়। ‘যাত্রিক ট্রাভেলস’-এর তরফ থেকে জানানো হয় অক্টোবরে ১১টি কেরল ট্যুরে মোট যাত্রী সংখ্যা ৪৪০ জন। আর এখনও অবধি ‘নো ক্যানসেলেশন’।
শুধু দেশেই নয় আন্তর্জাতিক স্তরেও খ্যাতি পেতে শুরু করেছে কেরল। বরং দেশি পর্যটকের আগে বিদেশি পর্যটকদেরই আনাগোনা বেশি ছিল কেরলে। তাঁরাই কেরলকে বলতেন God’s Own Country। এখনও পর্যন্ত কেরল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। ‘কেরল ট্যুরিসম’-এর পরিসংখ্যান বলছে ২০১৩ সালের পর থেকে কেরলে অবিশ্বাস্য ভাবে বেড়েছে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা। হিসেব অনুযায়ী ২০১৪ সালে ৭% , ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ৬%, ২০১৭-তে ৫% বেড়েছে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা। একই ভাবে বেড়েছে দেশি পর্যটকের সংখ্যাও।
কিন্তু গত এক সপ্তাহে এই ছবিটা বদলেছে। বিধ্বংসী বন্যা কেড়ে নিয়েছে সাড়ে তিনশোরও বেশি প্রাণ। ঘরছাড়া হয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। কেরলের এই বন্যা ১৯২৪-এর ভয়াল স্মৃতিকে উস্কে দিয়েছে রাজ্যবাসীর মনে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হয়েছে ইদুকি জেলার। তবে আগের থেকে কিছুটা উন্নত হয়েছে আলাপুঝা, এর্নাকুলাম, ত্রিশূর এবং পথনমথিত্তায়। জল নেমেছে এ সব জায়গায়। ত্রিশূর ও চালাকুড়ি শহরের বেশির ভাগটাই চলে গিয়েছে জলের তলায়। কাজের জন্য সে রাজ্যে গিয়ে বন্যার কবলে পড়েছেন বাংলারও বহু মানুষ। মৃত্যুর খবর মিলেছে বেশ কয়েকজনের। বাংলা থেকে কেরলে পাড়ি দেওয়া স্পেশাল ট্রেনে চাপিয়ে বহু মানুষকে ফিরিয়েও আনা হয়েছে এ রাজ্যে।

‘কেরল ট্যুরিসম’ সূত্রে খবর, দেশি পর্যটকদের বেশিরভাগেরই পছন্দ কেরলের এর্নাকুলাম, ত্রিশূর এবং তিরুঅনন্তপুরম জেলা, যেখানে বিদেশি পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে এর্নাকুলাম এবং তিরুঅনন্তপুরম। ২০১৭ সালের হিসেব বলছে, এর্নাকুলামে দেশি পর্যটকের মোট সংখ্যা ২২ শতাংশ এবং বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৪২ শতাংশ। ২০২০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা উভয় ক্ষেত্রেই আরও ২০ শতাংশ বাড়ানোর চেষ্টায় রয়েছে কেরল সরকার।

সরকারি সূত্র বলছে, বন্যায় কেরলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। রাজ্য, জেলা এবং জাতীয় সড়ক মিলে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি সড়কপথ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। বিমানবন্দরগুলিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
তবে, স্বস্তির বিষয় ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে কেরল। স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার পথে রেলওয়ে ট্র্যাকগুলি। আগামী ২৯ অগস্ট ফের চালু হতে পারে কোচি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। সব মিলিয়ে তাই এখনও আশা ছাড়েনি বাঙালি। বিপর্যয় চলার গতি রুদ্ধ করতে পারে সাময়িক ভাবে, তবে সেটা কখনওই প্রাণের ছন্দ কেড়ে নিতে পারে না। সব বিপত্তি জয় করে মানুষ আবার তার বাঁচার রসদ খুঁজে নেয়। কেরলও ফিরবে আবার। তার সেই চেনা ছন্দে। একরাশ পার্থিব সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে পর্যটকদের সামনে হাজির করবে নতুন ধারায়। সেই আশায় বুক বেঁধেই এখন থেকেই ব্যাগ গোছাতে শুরু করে দিয়েছে বাঙালি। আপনি কী ভাবছেন?