দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত শনিবার সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে! ধর্মতলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছিলেন যাদবপুরের বামপন্থী ও অতি বামপন্থী ছাত্রদের একাংশ। তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মমতার মধ্যে কোনও ‘সেটিং’ হয়েছে রাজভবনে।
তার পর মাঝে চার দিন কেটে গিয়েছে। আপাত ভাবে কোথাও কিছু নেই। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের ধারে অতি বামদের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ‘গোপন’ বৈঠক করলেন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
এ ব্যাপারে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে শুক্রবার প্রশ্ন করা হয়েছিল দ্য ওয়াল-এর তরফে। কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “এ ধরনের কোনও বৈঠক হয়নি।”
আবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরাও বলেন, এ ধরনের বৈঠকের কথা তাঁরা জানেন না।
তবে বাস্তব হল, বৃহস্পতিবার কলকাতার এই অভিজাত হোটেলে ওই বৈঠক হয়েছে। তাতে উপস্থিত ছিলেন অতি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন মেন্টর। যদিও বৈঠকের কথা জানাজানি হতেই অনেকে বলছেন, যাঁদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে তাঁদের সঙ্গে বিশেষ ছেলেপুলে নেই। তাঁরা কতকটা স্বঘোষিত মেন্টরের মতোই।
প্রশ্ন হল, কেন অতি বামপন্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন শিক্ষামন্ত্রী?
পার্থবাবু যখন বৈঠকের কথাই অস্বীকার করছেন তখন তাঁর কাছে এই প্রশ্ন করা অর্থহীন। তবে তৃণমূলের শীর্ষ সারির একাধিক নেতার কথায়, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্লোগান তোলাটাই একমাত্র কারণ নয়। ছাত্ররা তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগান তোলায় দিদি কিছু মনে করেননি। বরং বলেন, ছাত্র আন্দোলন তো এমনই হবে। কিন্তু দিদির উদ্বেগ আন্দোলনের মধ্যে বিভাজন রেখা তৈরি হওয়া নিয়ে। নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে ঠিক যে কারণে বিরোধিতা জানাচ্ছে তৃণমূল, একই কারণে আপত্তি বামপন্থী ও অতি বামপন্থী ছাত্রছাত্রীদেরও। এ ব্যাপারে দুই শিবিরের মধ্যে কোনও সংঘাত নেই। সুতরাং এখন তাঁরা তৃণমূল বিরোধিতায় অবতীর্ণ হলে এবং ‘মোদীর সঙ্গে সেটিং’ বলে মমতার বিরুদ্ধে স্লোগান তুললে আখেরে লাভ হবে বিজেপিরই।
এর নেপথ্যে ভোটের একটা পাটিগণিতও রয়েছে। বিজেপি বিরোধী ভোট তৃণমূল ও বামেদের মধ্যে ভাগাভাগি হলে সুবিধা হবে দিলীপ ঘোষেদেরই। সূত্রের মতে, অতি বামপন্থীদের কাছে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে বৈঠকে জানতে চেয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁরা পার্থবাবুকে জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁদের কোনও মতান্তর নেই। তবে হ্যাঁ, তৃণমূল বাংলায় যে ভাবে রাজনীতি করছে তা নিয়ে তাঁদের কিছু বক্তব্য রয়েছে।
সূত্রের খবর, বৈঠকে উপস্থিত অতি বামপন্থীদের কয়েকজনের এও বক্তব্য যে, সংখ্যালঘুদের মধ্যেও তৃণমূলের কারণেই রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হচ্ছে। কারণ, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় তৃণমূলের দাপুটে কিছু সংখ্যালঘু নেতার দাপটে সেখানকার মানুষজন, বিশেষ করে মুসলিমরাই অসন্তুষ্ট।
পর্যবেক্ষকদের মতে, লোকসভা ভোটের পর থেকেই তৃণমূলের কাছে পরিষ্কার যে একুশের ভোটের আগে বাংলায় ধর্মীয় মেরুকরণের ষোলো কলা পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। নাগরিকত্ব আইন, এনআরসি ইত্যাদি প্রশ্নে মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে। তবে তার মধ্যেই কিছুটা আশার আলোও দেখেছে তৃণমূল। তা হল, নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের প্রশ্নে শহুরে ছাত্র-যুব সমাজে মোদী সরকার বিরোধী প্রতিক্রিয়া জোরালো। তৃণমূল নিশ্চয়ই চাইছে যে এই ভোটের বিভাজন কোনও ভাবেই যাতে না হয়। সম্ভবত সেই কারণেই গোপন বৈঠকে বসতে হয়েছে পার্থবাবুকে। তবে এটা ঠিক, অতি বামপন্থীদের সঙ্গে পাঁচতারা হোটেলে বৈঠক করাটা বেশ মজার!