দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুজফ্ফরনগর শহর ছাড়িয়ে রাস্তা ঢুকে গেছে অনেক ভিতরে। গলির পর গলি। লাডডেহয়ালার দিকে যেতে প্রথম গলির বাঁক পেরিয়ে পড়বে একটা অপরিচ্ছন্ন সাইন বোর্ড। সেখান থেকে পরের গলির পথ আরও সরু। দু’পাশে ঘিঞ্জি বাড়িঘর। গলির শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখা মিলবে একটি বহু পুরনো মন্দিরের। দু’টি বাড়ির মাঝে কোনওরকমে জায়গা করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মন্দিরটি। এই মন্দিরের চাতালে বসেই হিন্দু প্রতিবেশীদের ফিরে আসার অপেক্ষা করেন গুলজার সিদ্দিকি, পাপ্পু ভাই, কায়য়ুম আহমেদ, নৌসাদ, জাহিদ আহমেদরা।
গোটা এলাকাটাই মুসলিম অধ্যুষিত। গুটি কয়েক ঘর রয়েছে হিন্দুদের। তবে, শান্ত পাড়াতে আজ অবধি কোনও ঝামেলার খবর নেই। সবাই মিলেমিশে একই সঙ্গে যোগ দেন যে কোনও পার্বণে। পাড়ার বর্ষীয়ান বাসিন্দা মেহেরবান আলির কথায়, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর এলাকা ছেড়ে চলে যান হিন্দুরা। সালটা আন্দাজ ১৯৯০-৯২ হবে। তার পর থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে মন্দিরটি।
যদিও মন্দিরটিতে এখন আর কোনও বিগ্রহই নেই। হিন্দু পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় মন্দিরের বিগ্রহ নিজেদের সঙ্গেই নিয়ে যায়। কিন্তু, এই বিগ্রহহীন মন্দিরেই যে ছড়িয়ে রয়েছে একসময় অত্যন্ত কাছের মানুষগুলির নানা স্মৃতিচিহ্ন। তাই দু’বেলা মন্দিরটি ধোয়ামোছা, পরিস্কারের কাজ করেন পাড়ার মুসলিম পরিবারগুলি। প্রত্যেক দিওয়ালিতে মন্দিরে দেওয়ালে সাদা রঙের প্রলেপ পড়ে। প্রতি বছর এ ভাবেই নতুন করে সেজে ওঠে মন্দিরটি। এমনটাই জানালেন মেহেরবান আলি।
নিজের বাড়ির দাওয়ায় বসে পুরনো দিনের স্মৃতিতে ফিরে যান মেহেরবান। স্মৃতির পাতা উল্টোতে উল্টোতে বলেন, ‘‘আমার খুব কাছের একজন ছিল জিতেন্দ্র কুমার। সাম্প্রদায়িক হিংসা সে সময় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আমি বারণ করেছিলাম এলাকা ছেড়ে যেতে না। কিন্তু, পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে চলে গেল।’’ জিতেন্দ্র কুমারের সঙ্গে সে সময় এলাকা ছেড়ে চলে যায় আরও জনা কুড়ি হিন্দু পরিবার। মেহেরবানের কথায়, ‘‘তারা সবাই ছিল খুব আপন। যাওয়ার সময় কথা দিয়ে গেছে একদিন ঠিক ফিরে আসবে।’’
লাডডেহওয়ালার ছোট্ট পাড়াটিতে এখন ৩৫টি মুসলিম পরিবারের বাস। সবাই পালা করে মন্দিরের দায়িত্ব নিয়েছেন। এলাকার বাসিন্দা জাহির আহমেদের কথায়, ‘‘প্রতিদিন মন্দিরটি পরিস্কার করা হয়। নিয়মিত পরিচর্চা করা হয় মন্দিরের। যখন আমাদের প্রতিবেশীরা ফিরে আসবে তারা তাদের মন্দিরকে একই ভাবে দেখতে পাবে।’’
চলে যাওয়া হিন্দু প্রতিবেশীরা যেন তাঁদের মুসলিম ভাইবোনদের উপর থেকে ভরসা না হারায়, সেই বিশ্বাসের জায়গা যেন অটুট থাকে। এমনটাই চান নাদিম খান, মাকসুদ আহমেদ, জাহিদ আহমেদরা। তাই প্রায় ২৬ বছর কেটে গেলেও অপেক্ষায় ছেদ পড়েনি। একটা একটা করে বছর কাটে, আর নতুন করে আপনজনদের ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে লাডডেহওয়ালার ছোট্ট পাড়াটি।