
শেষ আপডেট: 16 January 2019 18:30
খুদে পড়ুয়ার সঙ্গে সৃজনা সুব্বা[/caption]
দার্জিলিঙের নাগরি চা বাগান লাগোয়া এলাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৃজনার। পেশায় শিক্ষিকা। নেশায় লেখিকা। পোখরিয়াবং গার্লস হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুলে খুদেদের প্রিয় শিক্ষিকা সৃজনার অন্যতম লক্ষ্য নিজের ছাত্রছাত্রীদের সিলেবাসের বাইরেও নতুন কিছু শেখানো। পাঠ্যবইয়ের গড়পড়তার মধ্যে হাঁপিয়ে ওঠা শৈশবকে সমাজ ও প্রকৃতির পাঠ পড়ানো। স্কুলের গন্ডির বাইরেও যে একটা বিশাল আকাশ আছে, তার শিক্ষা দিতেই ‘দ্য বুক থিফ’-এর ভাবনা। সাইব্রেরিতে রয়েছে পাঁচশোরও বেশি বই। কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাহায্য ছাড়াই এই বই গুলো জোগাড় করেছেন তিনি। বেশিরভাগই তাঁর নিজের সংগ্রহ।
‘‘আমারা বাবা, মা দু’জনের পেশাই ছিল শিক্ষকতা। প্রাথমিক স্কুলের খুদেদের পড়িয়ে আনন্দ পেতেন। বইয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা তৈরি হয় ছোটোবেলাতেই। বাবা, মায়ের সান্নিধ্যে,’’ চোখে-মুখে আনন্দ সৃজনার। বললেন, ‘‘যখন নার্সারিতে ছিলাম মা আমাকে একটা বড় বই উপহার দিয়েছিলেন। মোটা বইটার নাম জেনেছিলাম ডিকশনারি। পাতা উল্টিয়ে প্রথম যে শব্দটা শিখেছিলাম সেটা ছিল Butterfly।’’
বইয়ের প্রতি এই অনুরাগের বীজ শিশুমনেও পুঁতে দিতে তাই মরিয়া সৃজনা। গ্রামের সব শিশুদেরই অবারিত দ্বার তাঁর লাইব্রেরি। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া তো বটেই, তিন বছরের শিশুও তার অভিভাবকের হাত ধরে লাইব্রেরিতে আসে। তাদের মনের মতো রঙিন ছবির বই আছে লাইব্রেরিতে। সাহিত্য, দর্শন, কবিতা, সমাজতত্ত্ব থেকে কিশোর গল্প— সৃজনার সংগ্রহের তালিকাটা দীর্ঘ। লাইব্রেরিতে বসেই নিয়মিত বাচ্চাদের ক্লাস নেন তিনি। কী ভাবে বই পড়তে হয়, কোন কোন বই পড়া উচিত সব কিছুই শেখানো হয় সৃজনার ছোট্ট ক্লাসে। খুদেদের সঙ্গে সেখানে আনাগোনা রয়েছে বড়দেরও।
‘‘নিজের গাড়ি বেচে দিয়েছি। তার থেকে কিছুটা খরচ উঠেছে। আমার বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীদের থেকেও অনুদান পেয়েছি। সেই নিয়েই নিজের বাড়ির গ্যারাজেই খুলে ফেলেছি আমার সাধের ‘দ্য বুক থিফ’। সকলের শুভকামনাই আমার চলার পথের প্রেরণা,’’ বলেছেন সৃজনা। এই লাইব্রেরিতে যেমন পড়াশোনা আর রঙিন গল্পের বইয়ের দেদার মজা রয়েছে, তেমনি রয়েছে কড়া অনুশাসনও। নির্দিষ্ট সময়, তারিখ লিখে বই নেওয়া, আবার ঠিক দিনে সেই বই ফিরিয়ে দেওয়া—নিয়ম মেনে চলে খুদেরাও।
সৃজনা চান তাঁরই মতো শিক্ষার প্রসারে এগিয়ে আসুন বাকিরাও। আজকের এই ‘ডিজিটাল যুগে’ হাত বাড়ালেই তথ্যের ভাণ্ডার, যেখানে জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত। কিন্তু সেখানে মননশীলতার প্রকাশ নেই, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ নেই। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে সবার সদর্থক ভূমিকা প্রয়োজন বলেই মনে করেন সৃজনা। তাঁর কথায়, গ্রামে গ্রামে, মফস্বলে এমন ছোট ছোট লাইব্রেরি বানিয়ে দুঃস্থ শিশুদেরও যদি টেনে আনা যায়, তাহলে সার্বিক স্তরে শিক্ষার বিকাশ হয়।
জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ১৯৯৫ সালের ২৩ এপ্রিল তারিখটিকে আন্তর্জাতিক বই দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। তাতে সচেতনতা কতটা বেড়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। ডিজিটালেই তথ্য হাতড়াতে আমরা বেশি অভ্যস্ত, হাতে নিয়ে বইয়ের স্বাদ চাখার সময়ের বড় অভাব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘‘ভালো বই আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়।’’ শুদ্ধিকরণের মাপকাঠি বিচার করা উদ্দেশ্য নয়, বরং কচি মনে গোড়া থেকেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জাগানোটাই মূল লক্ষ্য সৃজনার। খুদেদের পাশে বসে, হাত ধরেই তাই জীবনের পাঠ দিয়ে চলেছেন তিনি।
আরও পড়ুন: