
শেষ আপডেট: 13 December 2018 18:30
কুইনসল্যান্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ডঃ জর্জ রফ জানিয়েছেন, সবচেয়ে বড় কারণ মানুষের ভয় ও আতঙ্ক। হাঙর মানেই শিকারি প্রাণী। সাধারণত এরা গভীর সমুদ্রে থাকতেই ভালোবাসে। মাঝে মাঝে শিকারের লোভে সৈকতের কাছাকাছি এসে পড়ে। আর প্রবাল প্রাচীরের শোভা দেখতে কুইনসল্যান্ডের সৈকতে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। হাঙর-ঘটিত দুর্ঘটনা যে আগে ঘটেনি তা নয়, তাই সেই ১৯৬২ সাল থেকেই হাঙরদের মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে সৈকত ও উপকূলের কাছাকাছি অগভীর জলে জাল বিছিয়ে রাখার রেওয়াজ শুরু হয়েছে। সাঁতরে এসে এই জালে জড়িয়েই মৃত্যু হয় অধিকাংশ হাঙরের। তা ছাড়া হাঙর-ধরো অভিযান তো রয়েছেই। কখনও ব্যবসার খাতিরে আবার কখনও নিছক শিকারের নেশায় মানুষ এই এলাকায় হাঙরদের নিশানা বানাচ্ছে বহুকাল ধরেই।
গ্রেট হোয়াইট শার্ক[/caption]
[caption id="attachment_61282" align="alignnone" width="642"]
বাস্কিং শার্ক[/caption]
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, গ্রেট হোয়াইট শার্ক দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০ ফুটের কাছাকাছি হয়, ওজন প্রায় ২,২৬৪ কেজি। এরা কম করেও ৩০ বছর বাঁচে। আচরণে প্রচণ্ড হিংস্র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এই জাতীয় হাঙরেরা মানুষখেকো হয়ে ওঠে। জলের গভীরে তো বটেই জলের উপরেও শিকার ধরতে এরা পটু। এণন দক্ষ শিকারিদের নিশানায় প্রায়ই ধরা পড়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া মৎস্যজীবী থেকে সৈকতে স্নানরত পর্যটকরা। গ্রেট হোয়াইট শার্ক দেখলেই তাই মেরে ফেলার রীতি শুরু হয়েছিল দীর্ঘকাল ধরেই। তা ছাড়া সৈকতের কাছাকাছি জায়গায় জাল বিছিয়ে ধরা হত এই হাঙরদের, তারপর এদের মাংস চলে যেত বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয়। ২০১০ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্ব জুড়ে এই গ্রেট হোয়াইট শার্কের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩,৫০০। ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে চলে যাচ্ছে এই প্রজাতি।
[caption id="attachment_61284" align="alignnone" width="616"]
ডাস্কি শার্ক[/caption]
[caption id="attachment_61285" align="alignnone" width="591"]
স্ক্যালোপেড হ্যামারহেড[/caption]
তা ছাড়াও বিরলের তালিকাভুক্ত হয়েছে আরও পাঁচ প্রজাতির হাঙর। তাদের মধ্যে বাস্কিং শার্ক (Basking Shark)— নিরীহ প্রকৃতির এই হাঙররা সাধারণত জলের গভীরেই থাকতে পছন্দ করে। তবে এদের পাখনা (Fin) মানুষের খুব উপাদেয় খাদ্য। চিনে ওষুধ তৈরির জন্যও ব্যাপক হারে শিকার করা হয় এই হাঙরদের। ডাস্কি শার্ক (Dusky Shark)— ন্যাশনাল মেরিন ফিসারিজ সার্ভিসের রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে এই হাঙরের সংখ্যা কমেছে বিপজ্জনকভাবে। তারও প্রধান কারণ যথেচ্ছ ভাবে হাঙর শিকার। স্ক্যালোপেড হ্যামারহেড (Scalloped Hammerhead)— গত ৩০ বছরে এই প্রজাতির হাঙরের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। ২০০৮ সালেই হ্যামারহেডকে বিরলের তালিকাভুক্ত করেছিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব নেচার (IUCN)। হোয়েল শার্ক (Whale Shark)— ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের এই হাঙরকে মানুষরা তাদের শত্রুই মনে করে। প্রায় ১০০ বছর বাঁচে এই প্রজাতি। শিকারের জন্য হোয়েল শার্ককেই নিশানা করে বেশিরভাগ শিকারিরা। ভারত, ফিলিপিন্স ও তাইওয়ানে আইন করে এই হাঙরের শিকার বন্ধ করা হয়েছে।
[caption id="attachment_61286" align="aligncenter" width="590"]
হোয়েল শার্ক[/caption]
‘কমিউনিকেশন বায়োলজি’ নামে একটি বিজ্ঞানপত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় অ্যাপেক্স শার্কের গতি ঘণ্টায় ৬০ মাইল, গ্রেট হোয়াইট শার্কের ঘণ্টায় ২৫ মাইল। অ্যাপেক্স শার্ক সাধারণত বড় প্রাণি শাকির করে যেমন ডলফিন, কচ্ছপ, সামুদ্রিক পাখি। সুযোগ পেলে মানুষও। তাই অ্যাপেক্স শার্ক শিকার উপকূল এলাকায় রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়েই হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই হাঙরদের বিলুপ্তি উপকূল এলাকার বাস্তুতন্ত্রের প্রবল আঘাত করছে। ভারসাম্য ধসে যেতে বসেছে।
হাঙর-খুনে লাগাম পড়ানোর জন্য বহুদিন থেকেই নানা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে কুইনসল্যান্ড শার্ক কন্ট্রোল প্রোগ্রাম (QSCP)। উফকূলবর্তী এলাকা থেকে হাঙর ধরে গভীর সমুদ্রে ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যাতে মানুষ ও হাঙরের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ করা যায়। হ্যামারহেড, টাইগার ও হোয়াইট শার্কের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৭৪ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৯২ শতাংশ। উপকূলের কাছাকাছি এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি শিকার করা হয় হাঙরদের। গবেষকদের উদ্যোগে, ২৩% হ্যামারহেড, ২৬% টাইগার শার্ক, ৪৫% হোয়েলার শার্ক, ২% গ্রেট হোয়াইট ও ৪% অন্যান্য প্রজাতির হাঙরদের উপকূল থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। গবেষক ডঃ জর্জ রফের মতে, এইভাবে কিছুটা হলেও হাঙরের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে।