.webp)
শাহজাহান লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন অনুব্রতকে’, যেভাবে বাদশার খাজানায় ১৩৩ কোটি । ছবিঃ শেখ শাহজাহান
শেষ আপডেট: 3 April 2024 15:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বীরভূম জেলায় শাসক দলের সভাপতি ছিলেন অনুব্রত মণ্ডল। তাঁর এক হাঁকে চড়াম চড়াম ঢাক বাজত, বাঘে ভেরায় এক সঙ্গে দুধ খেত, গুরু বাতাসায় ভোটের লুঠ হত—ইত্যাদি হরেক কিংম্বদন্তি তৈরি হয়ে গেছে এতদিনে।
সে তুলনায় সন্দেশখালির শেখ শাহজাহানের রাজনৈতিক পরিচয় মামুলি। সামান্য এক ব্লক সভাপতি। কিন্তু ইডির দাবি, যে ভাবে বাদশা তার খাজানা ভরেছিল, তাতে অনুব্রত মণ্ডলও লজ্জায় পড়ে যাবেন। অনুব্রতর মোট সম্পত্তির পরিমাণ যোগ বিয়োগ করে ইডি কষ্টেসৃষ্টেও একশ কোটি পার করাতে পারেনি। বড় কথা হল, কেষ্ট মন্ডল সেই সব সম্পদ করেছিলেন দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সন্দেশখালির নেতাটির নামের মধ্যেই রাজকীয় ব্যাপার রয়েছে। তা ছাড়া তরুণ প্রজন্ম তুলনায় প্রবীণদের চেয়ে অসহিষ্ণু। ইডির দাবি, ২০১৭-১৮ সাল থেকে এক প্রকার টি-টোয়েন্টি খেলেছেন শাহজাহান শেখ।
২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ সালে তার অ্যাকাউন্টে চিংড়ি বিক্রি বাবদ ৩৩ কোটি টাকা প্রাপ্তি দেখানো হয়েছে। তার প্রোপ্রাইটরশিপ কোম্পানির নাম শেখ সাবিনা ফিশারি। এই অ্যাকাউন্টে মেসার্স অরূপ কুমার সোম ওই দুই অর্থ বছরে পেমেন্ট করেছেন ৩৩ কোটি টাকা।
আর ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ আর্থিক বছরে ম্যাগনাম এক্সপোর্ট থেকে সাবিনা ফিশরিজের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে ১০৪ কোটি টাকা।
ইডির দাবি, এই লেনদেন জ্যান্ত চিংড়ির বদলে হয়নি। হিন্দিতে বলা যায় খেয়ালি চিংড়ি। অর্থাৎ এখানে চিংড়ির চরিত্র অনেকটা কাল্পনিক। ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ চিংড়ি বিক্রির হিসাব আসলে ভুয়ো। কোনও বিক্রি হয়নি শুধু খাতায় এন্ট্রি দেখিয়ে পেমেন্ট করা হয়েছে। শাহজাহান শেখ ক্যাশ টাকা দিয়েছে ম্যাগনাম এক্সপোর্টকে। সমপরিমাণ টাকা হোয়াইটে তার সাবিনা ফিশারিজের অ্যাকাউন্টে ফেলেছে ম্যাগনাম এক্সপোর্ট। এই ম্যাগনাম এক্সপোর্টের অংশীদার অরুণ সেনগুপ্ত ভর ভর করে সেগুলো এখন উগরে দিয়েছেন ইডির সামনে।
ইডির কাছে অরুণ সেনগুপ্তর জবানবন্দিও অনেকটা সিনেমার মতো। অরুণ জানিয়েছেন, শাহজাহান তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। তাঁর দুটি মেয়ে আছে। পরিবারের নিরাপত্তার কারণেই ভয় পেয়ে এই বেআইনি লেনদেন করতে তিনি বাধ্য হয়েছেন বলে ইডিকে জানিয়েছেন।
তবে ইডি আদালতকে জানিয়েছে, এই অরুণ সেনগুপ্ত বা অরূপ কুমার সোমের কাছে অর্থবর্ষ ধরে ধরে যে হিসাব তথা এন্ট্রির খতিয়ান চাওয়া হয়েছিল, তা তাঁরা এখনও দেননি।
ইডির দাবি, সন্দেশখালির বাদশা যে চিংড়ি বিক্রি করত তার মাত্র ১৫ শতাংশ নিজের ফার্মে উৎপাদিত হত। ৫০ শতাংশ আসত অন্য মৎস্য ব্যবসায়ীদের থেকে। ২০১৯ সালে এলাকার সমস্ত মৎস্য ব্যবসায়ীকে সন্দেশখালির মার্কেটে ডেকে এ জন্য হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিল সে। এর পরেও বাকি ৩৫ শতাংশ চিংড়ি সে সংগ্রহ করত গায়ের জোরে দখল করা ভেরি বা ফার্ম থেকে।
তার টিমের একটা তালিকাও তৈরি করেছে ইডি। সেই একাদশের খেলোয়াড়রা হল আইজুল মোল্লা, সাবির গাজি, রেজাউল নাইয়া, নাসির শেখ, আবদুল মোল্লা, সইফুদ্দিন শেখ, মুজিবর শেখ ও আবদুল খালেক মোল্লা। হিসাবে দেখানো হত যে এরা সাবিনা ফিশারিজকে চিংড়ি বেচত। অথচ ঘটনা হল, এদের নামে কোনও ফার্ম বা ভেরি নেই।
ইডি সূত্রের মতে, অনুব্রত মণ্ডল যেভাবে চালকল দখল করে নিজের নামে করিয়ে নিয়েছিলেন, শেখ শাহজাহান সেই পথে হাঁটেনি। বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যার জমি বা ভেরি তাঁর নামেই রয়েছে। শুধু সেই জমির ফসল ঘরে তুলেছে সে।
ইডি আরও জানিয়েছে, সাবিনা ফিশারিজ থেকে বেশি কিছু অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার হয়েছে। তারা হল, দিদার বক্স মোল্লা, শিব হাজরা, শেখ শাহজাহানের ভাই শেখ আলমগীর ও শেখ সিরাজউদ্দিন। রমজান আলি মোল্লা, শরাফত মোল্লা, মইদুল মোল্লা, ফিরোজ শেখ, রমজান আলি মোল্লা, শফিক মোল্লা, ফিরোজ শেখ, সুশান্ত সরকার, কুতুবুদ্দিন শেখ, সিরাজুল লস্কর, আবদুল মাজেদ শেখ প্রমুখ। শাহজাহান ঘনিষ্ঠ মইদুলের দাবি, এদের নামে বেনামে সম্পত্তি করার জন্যই টাকা পাঠানো হত।
ইডি সূত্রে বলা হচ্ছে, এখনও পর্যন্ত যে পরিমাণ বেআইনি লেনদেনের হদিশ পাওয়া গিয়েছে, তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। খুঁজলে ও খুঁড়লে আরও সম্পত্তির হদিশ মিলতে পারে।