
শেষ আপডেট: 6 October 2018 18:30
সরকার বাড়িতে শুরু হল পুজো। তখন তার ঠিকানা ছিল ৫৫, বাগবাজার স্ট্রিট। পুজো তো শুরু হল, কিন্তু পয়সা কই! সবাই মিলে দিয়ে থুয়ে যা হল, ছোট করেই শুরু হল পুজো। নাম হল সরকার বাড়ির পুজো। বছর ঘুরল, পুজো তার জায়গা বদল করল। কারণ ততদিনে দর্শকের সংখ্যা বেড়েছে। নামও ছড়িয়েছে ভালোই। পত্রপাট গুটিয়ে পুজো তার নতুন জায়গা নিল নেবুবাগান লেনে। মুষ্টিমেয় নয়, পুজো তখন পুরোদমে বারোয়ারি। নাম দেওয়া হল ‘নেবুবাগান বারোয়ারি দুর্গা পূজা’। প্রায় তিন বছর নেবুবাগানেই বেশ জাঁক জমকের সঙ্গে চলল পুজো। উত্তর কলকাতার সীমানা ছাড়িয়ে তখন গোটা রাজ্যেই এই পুজোর সুখ্যাতি। দূর দূরান্ত থেকে পুজো দেখতে আসছেন অনেকেই। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পুজো হয়ে উঠল মিলনের উৎসব।
তাও মন ভরে না। কী যেন একটা কম। সবই আছে তবু কী যেন নেই! আসলে আবেগ দিয়ে পুজো শুরু তো, তখন তো আর থিম থুড়ি প্রতিযোগিতার কচকচানি ছিল না, মৃদু হেসে বললেন শেখরবাবু। তখনকার পুজো উদ্যোক্তারা প্রায় প্রত্যেকেই স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। মুখে মুখে পুজোর প্রচারও কিছু হম হচ্ছে না। লোকের ভিড়ও বাড়ছে, সেই সঙ্গে চিন্তাও। জায়গাও যে অফুরন্ত এমনটা নয়। কাজেই ফের ঠিকানা বদল। ১৯২৫-এ কাঁটাপুকুরে এবং ১৯২৭ সালে বাগবাজার কালী মন্দিরে শুরু হল পুজো।
শুরুটা যাঁরা করেছিলেন তাঁদের অনেকেই হয় বাসা ছেড়েছেন, নয়তো কর্মসূত্রে অন্য জায়গায় বদলি হয়েছেন। পুজো কিছুটা ছন্নছাড়া। সেই উদ্যমটা অনেক কমেছে। ভরা জোয়ারের শেষে আকস্মিক ভাটা যেন। নৌকা বেসামাল হওয়ার আগেই হাল ধরলেন সমাজ সেবী নরেন্দ্র নাথ ঘোষাল। গোটা দেশ যাঁকে চেনে ‘দাদাঠাকুর’ নামে। তাঁর হাত ধরেই ১৯২৭ সালের পর থেকে পুজোতে একটা আলাদা মোচড় এল। অনেক সংগঠিত হল পুজো। সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী থেকে সমাজ সেবী- একে একে জড়িয়ে পড়তে শুরু করলেন পুজোর সঙ্গে। যে পথটা দেখালেন ‘দাদাঠাকুর’ সেই পথ ধরেই পুজোকে এগিয়ে নিয়ে চললেন দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রখ্যাত আইনজীবী দুর্গাচরণ সেই সময় ছিলেন কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের অন্যতম প্রধান।
সময় এগোচ্ছে ঘোড়ার গতিতে। বছর ঘুরছে। ১৯৩০ সাল। তৈরি হল পুজো কমিটি। প্রেসিডেন্ট হলেন দুর্গাচরণ। তাঁর মাথায় তখন অন্য চিন্তা। পুজোর গরিমাকে আরও উর্ধ্বে তুলতে হবে। বনেদিয়ানার তো কোনও অভাবই নেই, যেটার অভাব রয়েছে সেটা হল একজন উপযুক্ত কাণ্ডারীর। যার ছোঁয়ায় পুজো অন্য মাত্রা পাবে। বিদ্যুতের মতো দুর্গাচরণের মাথায় খেলে গেল সেই নাম। স্বাধীনতার আদর্শে শুরু হওয়া এই পুজোর পথপ্রদর্শক হতে পারেন একজনই। তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস। নেতাজী তখন কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র। দুর্গাচরণের আবেদন ফেলতে পারলেন না নেতাজী। দু’জনের উদ্যোগেই পুজো কালী মন্দির থেকে পাকাপাকি ভাবে সরে এল সর্বজনীন মাঠে, তখন যার নাম ছিল ‘মেটাল ইয়ার্ড’। পুজোর একটা হিল্লে তো হল, এ বার নেতাজীকে ধরে রাখা যায় কী ভাবে। ফের কপালে ভাঁজ পড়ল দুর্গাচরণের।
নেতাজী তখন নানা কাজে ব্যস্ত। তাঁর কাছে প্রস্তাব নিয়ে গেলেন দুর্গাচরণ। দুর্গাপুজোর প্রেসিডেন্টের পদ নিতে হবে তাঁকে। তিনি না, করে দিলেন। কিন্তু দুর্গাচরণ নাছোড়। শেষে রাজি হলেন নেতাজী। ১৯৩৬ সাল থেকে পুজোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়লেন। ১৯৩৮-৩৯ সাল পর্যন্ত পুজোর প্রেসিডেন্ট ছিলেন নেতাজী। তাঁর সময় পুজোর নাম বদলে হল ‘বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী’। পুজো প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে নেতাজী গর্জে উঠলেন, “দুর্গা মায়ের পুজোর সঙ্গে দেশমায়ের পুজো করো।” মাতৃবন্দনাকে দেশমাতৃকার বন্দনার রূপ দিতে বিপ্লবীরা অষ্টমীর সকালে শুরু করলেন ‘বীরাষ্টমী উৎসব’। এই প্রথা আজও রয়েছে। লাঠিখেলা, জিমন্যাস্টিক, ক্যারাটে ইত্যাদি নানাবিধ শারীরিক কসরত করতেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। নেতাজীর সঙ্গে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, স্যর হরিশঙ্কর পাল ভারতের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বরা জড়িয়ে পড়লেন পুজোর সঙ্গে।
https://www.youtube.com/watch?v=yJBG6TtYBik
বাগবাজার সর্বজনীনে যে প্রাণের জোয়ার এনেছিলেন নেতাজী, তার রেশ পরবর্তী প্রজন্মগুলিতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। আদর্শ দেশনেতার হাত ধরে পুজোও হয়ে উঠছিল সর্বজনীন, সর্বাঙ্গ সুন্দর। নেতাজীর পর নানা সময় বিভিন্ন নামী দামি মানুষ এই পুজোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন যুগান্তর পত্রিকার কর্ণধার তুষারকান্তি ঘোষ, রমাকান্ত ঘোষ, আনন্দবাজার পত্রিকার কর্ণধার অশোক কুমার সরকার-সহ আরও অনেকে। এর পরেও নানা উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে গেছে পুজো। ফের পরিবর্তন আসে ১৯৯৬ সালের পর থেকে। শেখরবাবু জানালেন, পুজো ফান্ড তৈরি হয়। ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুরু হয়। প্রতিমায় বদল না হলেও মণ্ডপ ও আলোকসজ্জায় পরিবর্তন আসে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মণ্ডপসজ্জায় থিমের চমক লাগে। নতুন করে পুজোর বেদী তৈরি হয়।বিসর্জনের পদ্ধতিতেও দেখা যায় অভিনবত্ব। আভিজাত্যের ঠাস বুনোটে মহালয়া থেকে লক্ষ্মী পুজো পর্যন্ত নানা আচারে-অনুষ্ঠানে পুজো হয়ে ওঠে জমজমাট।
এত কিছু বদল হলেও প্রতিমার আদলে কিন্তু কোন বদল হয়নি। সেই ধবধবে দুধসাদা জড়ি-চুমকির ডাকের সাজের প্রতিমা। একশ বছর আগে যেমনটা ছিল, এখনও তেমনটাই রয়েছে। টানা দু’টি চোখে দেবী সর্ব তাপহন্তা অভয়প্রদায়িনী। এক চালের প্রতিমা। শেখরবাবুর কথায়, এই একচালের ধারণাটা এসেছিল এক জোট হবার বাসনায়। একই ছাদের তলায় উমার গোটা পরিবার, পরোক্ষে দেশপ্রেমীরা বলতে চাইলেন সঙ্ঘবদ্ধ হও, এক ছাদের তলায় এসো, জোট বেঁধে লড়াই করো।
বীরাষ্টমীর মতোই সিঁদুর উৎসবও বাগবাজার সর্বজনীনের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। দশমীতেই প্রতিমা নিরঞ্জনের প্রথা। সেটা বদল হয় না, যদি না কোন সরকারি নির্দেশিকা জারি হয়। তার আগে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠে আবালবৃদ্ধবনিতা। শতবর্ষ বলে এ বার উদ্যোগ-আয়োজনও অনেক বেশি। দিন কয়েক আগেই প্রভাতফেরী হয়ে গেছে। মহালয়ায় উদ্বোধন। তার পর চলবে একের পর এক অনুষ্ঠান। তৃতীয়ায় হবে প্রদর্শনী, চতুর্থীতে নামী শিল্পীদের নিয়ে লোক সঙ্গীতের জমাটি আসর। পঞ্চমীতে বন্ত্র বিতরণ, সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একাদশীর দিনে উত্তর কলকাতার ৩৫টি স্কুলের কৃতী ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। আবার দ্বাদশীতে তনুশ্রী শঙ্করের নাচের অনুষ্ঠান।
গোধূলির গেরুয়া আলোয় আলোচনা শুরু হয়েছিল। কখন যে সন্ধের গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে খেয়ালই করিনি। শেখরবাবুর দু’চোখে এখনও পুরনো দিনের হাতছানি। স্মৃতির পাতা উল্টে চলেছেন সমানে। আমার মনে হল, ‘অন্তরে যা লুকিয়ে রাজে, অরুণ বীণায় সে সুর বাজে, এই আনন্দ যজ্ঞে সবার মধুর আমন্ত্রণ।’