
শেষ আপডেট: 5 September 2018 18:30
পূর্ণবয়স্ক মানুষের মধ্যে যৌন প্রবণতার আসল দিকটি ঠিক কী! এর অনেকগুলো ব্যাখ্যা রয়েছে। যেমন রূপান্তরকামী কোনও পুরুষ বা নারী যখন যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয় সে বাস্তবে বিপরীত লিঙ্গের প্রতিই আকর্ষিত হয়। আবার এমন পুরুষও রয়েছেন যাঁরা শারীরিকভাবে পুরুষ, কিন্তু তাঁর মনে রয়েছে নারী সত্তা। সেই পুরুষ যখন অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে যৌন মিলন করেন তখন কিন্তু তিনি নিজেকে একজন নারী বলেই মনে করেন। অর্থাৎ মানসিক ভাবে এক নারীর সঙ্গে মানসিক ভাবে এক পুরুষের মিলন। সেটা কোনও ভাবেই Unnatural হতে পারেনা। একে নারী-পুরুষের মিলন বলেই আমি মনে করি।
আবার অন্য ধরণের ঘটনাও ঘটে। সাধারণত জেলখানায় এবং কলেজ হস্টেলে দেখা যায়। যেখানে জোর করে (Forcefully) কোনও পুরুষকে সঙ্গম করতে বাধ্য করা হয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে দুই পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষই একে Homosexuality বলে থাকেন। আসলে একে ঠিক ‘Homo’ বলা যায় না। তবে, সমকামিতাকে বৈধতা দেওয়ার পক্ষে হলেও যে কোনও ধরণের যৌন সম্পর্ককে আমি বৈধ বলতে পারিনা। যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে শিশুমেহন। আমি এই শিশুমেহনের বিপক্ষে। এই ধরণের ঘটনাকে আমি অপরাধ বলেই মনে করি।
(খ্যাতনামা সাহিত্যিক যিনি আনন্দ পুরস্কার এবং বঙ্কিম পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৫ সালে ‘হলদে গোলাপ’ বইয়ের জন্য আনন্দ পুরস্কার পান তিনি। এই বইটি সমকামী, তৃতীয় লিঙ্গের উপর গবেষণামূলক উপন্যাস।)
‘সোমনাথ’ থেকে ‘মানবী’ হওয়ার লড়াইটা ছিল সাঙ্ঘাতিক। আলোচনার ফাঁকে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় যখন উল্লেখ করলেন ‘লড়াই’ করতে হয়েছে, তখন পুরনো দিনের অনেক কথাই স্মৃতির ফাঁকে আনাগোনা করল। ঘরে-বাইরে প্রতিবন্ধকতা, মানুষজনের হ্যাটা এমনকি কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদানের পরেও সহ-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ‘অসহযোগিতা’র অভিযোগও এনেছিলেন তিনি।
মানবী বললেন, ‘‘দীর্ঘদিনের একটা ব্রিটিশ আইনের অবসান হল। আমি মনে করি এটা অনেকটা সাপের খোলস ছাড়ার মতো। আর এটা নিয়ে নতুন করে ভাবার কোনও দরকারই নেই। মনে করব এটাও একটা খোলসই ছিল। যেটা সরে গেল।’’
(মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমানে কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজের প্রিন্সিপাল।)
কিন্তু এই রায়ে কি মানুষের মানসিকতা পাল্টাবে? এ প্রসঙ্গে সুজয় বলেন, “নাহ্ পাল্টাবে না। কারণ সমাজের একটা বড় অংশ প্রথম থেকেই আমাদের প্রান্তিক মানুষ ভাবেন। এমনকী এই জয়টাকেও সবার জয় না ভেবে একটা সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের জয় ভাবেন। অতএব তাঁরা যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর আমূল বদলে যাবেন এমনটা আমার মনে হয় না। রাস্তাঘাটে আমায় লম্বা কুর্তা-গয়না পরে দেখলে তাঁরা বাঁকা চোখেই তাকাবেন। দু’টো খারাপ মন্তব্য করবেন। আমার অবশ্য তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু অনেকের তো যায়। অনেকেই এই ধরণের আচরণে খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েন। আর এই সামগ্রিক বিষয়টাতেই একটা বদল দরকার।
(ইনি একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী। টিভির পর্দায় পরিচিত মুখ।)
রায় ঘোষণার আগে অবধি খুব টেনশনে ছিলাম জানেন। ভাবছিলাম এ বারও যদি রায় আমাদের পক্ষে না যায় তাহলে কী হবে? এত লড়াই, এত আশা, সব কি নষ্ট হয়ে যাবে? তবে অবশেষে জয় এল। আর এটা তো সবার জয়। এবং আগত প্রজন্মের উপর আমার আশা রয়েছে যে তাঁরা আমাদের আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই দেখবেন।
আমি সমাজের প্রিভিলেজড ক্লাস থেকে এসেছি। তাই ছোটবেলা থেকে আমি সেভাবে কোনও সমস্যা পাইনি। আর আমি বরাবরই নিজের ব্যাপারে কনফিডেন্ট। তাই কেউ সেভাবে কখনও ঘাঁটায়নি। কিন্তু আমি এটাও জানি যে একটা বড় অংশের মানুষ এই সমস্যায় ভুগেছেন। কারণ এলজিবিটি সম্প্রদায়কে নিয়ে কথা বলা মানেই তো সেটা লুকিয়ে লুকিয়ে, ফিসফিস করে বলতে হয়। এটাই তো সমাজের নিয়ম।
আজকের পর থেকে যে কোনও সমকামী মানুষ বুক চিতিয়ে হাঁটতে পারবেন। আর হাঁটার দৃপ্ত ভঙ্গি দেখলে এ বার হয়তো বাঁকা চাউনি, কুরুচিকর মন্তব্য এগুলো একটু হলেও কমবে। আশা রাখছি ভবিষ্যতে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই বাঁচার অধিকার পাবো আমরা।
আজকের রায় ঐতিহাসিক তো বটেই। কিন্তু আমাদের সবার একটা বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত। ছোট থেকেই আমাদের উচিত আগামী প্রজন্মকে এই শিক্ষায় শিক্ষিত করা যে তারা যেন বুঝতে শেখে এলজিবিটি সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। সবটাই খুব সহজ-সরল-সাবলীল। স্কুল লেভেল থেকে এটা শেখালেই বোধহয় আগামী প্রজন্ম আমাদের সম্মানের চোখে দেখবেন।
(ইনি খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী)
আজ আমি খুব গর্বিত এবং খুশি। আমি নিজে কোনওদিন সে ভাবে কোনও অসুবিধার মুখোমুখি হইনি। তবে আমার অনেক বন্ধুদেরই দেখেছি খুব সমস্যায় পড়তে। আশা করছি এ বার থেকে তাঁদের এই সব সমস্যা খানিকটা হলেও কমবে। খানিকটা বললাম কারণ রায় পাওয়ার পরেও সমাজের মানুষ এত তাড়াতাড়ি বদলাবে না। এখনও অনেকেই বাঁকা চোখে দেখবেন। ভাববেন আমরা জোকার বা তাঁদের মনোরঞ্জন করার কোনও জিনিস। কিন্তু বিষয়টা তো তা নয়। আমরাও আর পাঁচজনের মতোই সাধারণ মানুষ। তবে আশা করি সময় লাগলেও, দেরি হলেও, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই সমাজের সবাই আমাদের সম্মানের চোখে দেখবেন। আমাদের আলাদা একটা সম্প্রদায় না ভেবে তাঁদেরই একজন ভাববেন।
(ইনি পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার।)