
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় । দ্য ওয়াল ফাইল
শেষ আপডেট: 30 March 2024 15:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বেস্ট সেলার বইয়ের লিস্টে আজও তিনি অবিনশ্বর। আজও বইয়ের তাকে রাখা তাঁর রহস্যকাহিনী থেকে ঐতিহাসিক কিংবা ভূতের গল্পের বিশাল পরিসরে বাঙালির মুগ্ধতা। তাঁর কলম থেমে যাওয়ার অনেক বছর পরেও যে বাঙালির জন্ম হয়েছে, তাঁদের কাছেও শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় স্বজন-বন্ধুর মতোই প্রিয় হয়ে রয়েছেন। গ্রাফিক্সের কাজ নির্ভর সায়েন্স ফিকশন ও ওটিটি সিরিজের যুগেও রাত জেগে শরদিন্দু পড়েন এমন যুবক-যুবতীর সংখ্যা নেহাত ফেলনা নয়।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৯-তে, জৌনপুরে। বড় হয়ে ওঠা মুঙ্গের আর পাটনায়। পারিবারিক ধারা মেনে ওকালতি শুরু করেও বছর তিনেক পরে সেসব ছেড়েছুড়ে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিবেদন। লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের কয়েক বছর পর প্রথমে বোম্বে টকিজে আর তারপর ফ্রিল্যান্স স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসাবে কাটিয়েছেন।
সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ থেকে ভূতান্বেষী বরদা, ঐতিহাসিক গল্প উপন্যাস থেকে সদাশিব বা অন্যান্য ছোটগল্প- সবই গোগ্রাসে খেয়ে ফেলি আমরা। ঐতিহাসিক কাহিনিগুলোয় রূপ-বর্ণ-গন্ধ-ভাষা দিয়ে এমন এক অসামান্য বাতাবরণ তৈরি করে যে তার সবটুকু মাধুর্য শুষে নিতে হাপিত্যেশ অপেক্ষায় থাকেন পাঠক। বিশ শতকের তিরিশের দশকের শিক্ষিত, মেধাবী, তীক্ষ্ণদৃষ্টি, যুক্তিবাদী যে যুবক সত্যান্বেষীটিকে সৃষ্টি করেছিলেন তিনি অনেক যত্নে,তার গল্প আজ এত বছর পরেও বেস্টসেলার।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম, ৩০ মার্চ, ১৮৯৯-এ। জন্মস্থান, উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে মামার বাড়িতে। বাবার নাম তারাভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মা বিজলীপ্রভা দেবী। শরদিন্দুরা দুই ভাই, তিনি ও অমরেন্দু আর এক বোন কল্যাণী। তারাভূষণ ছিলেন অত্যন্ত সফল আইনজীবী। বাড়িতে সকলেই ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী। তাই শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেন বাড়ি জুড়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্তের বই।
মুঙ্গের ট্রেনিং অ্যাকাডেমি ঘুরে মুঙ্গের জেলা স্কুল। এরপর ম্যাট্রিক শেষে এলাহাবাদে মামার বাড়িতে গিয়েছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছু হাত মকশো করা লেখার পর লিখলেন ‘প্রেমের প্রায়শ্চিত্ত’, যা পরে নাম পাল্টে হয় ‘দাদার কীর্তি’। তারপর চলে এলেন বিদ্যাসাগর কলেজে পড়াশোনা করতে। মেছুয়াবাজারের ওয়াইএমসিএ-র হস্টেল, বাদুড়বাগানের মেস এবং ৬৬, হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসে অবাধ বিচরণ করছেন। কলেজ পাশটাও হল এই করে। বাবার নির্দেশে আইন পড়া। তিনটি বছর মাঠে মারা গেল, অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে বিলাতি সিগারেট বর্জন। শেষে হতাশ বাবার দিকে তাকিয়ে পটনা ল’কলেজ থেকে আইন পড়লেন।
অবশেষে বছর ঊনত্রিশ বয়সে ‘বিজয়ী’ গল্পের জন্য পাঁচ টাকা উপার্জন। ১৯৩৩-এ প্রকাশ প্রথম গল্পগ্রন্থ, ‘জাতিস্মর’। এতেই আছে ‘মৃৎপ্রদীপ’ গল্পটি। প্রায় ৬ ফুটের শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম পাঠক মেরেকেটে সাড়ে চার ফুটের স্ত্রী পারুলবালা দেবী। দম্পতির তিন সন্তান, দিব্যেন্দু, অতনু, শান্তনু। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এই একমাত্র বান্ধবীটি সম্পর্কে বলছেন, সেন্সরশিপটা আমার ঘরে থেকে যাওয়ায় লাভ হয়েছে। ছাপা হওয়ার আগে লেখা আমি আর কাউকে পড়াই না। পারুলবালার সঙ্গে এমন সত্য-জীবনেও কিন্তু সাহিত্যের রূপ-রস-গন্ধ আছে। এই স্বামীর জন্য পারুলবালার একটিই কাজ। প্লেট প্লেট আলুভাজা, চা করা।
ব্যোমকেশ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয় সৃষ্টি। ১৯৩২-এ আবির্ভাব ব্যোমকেশের। ব্যোমকেশ-কেন্দ্রিক পূর্ণ কাহিনির সংখ্যা ৩২টি। ‘পথের কাঁটা’, ‘সীমন্ত-হীরা’, ‘সত্যান্বেষী’, ‘বেণীসংহার’ প্রভৃতির লেখকের সঙ্গে সৃষ্ট চরিত্রের বয়সের ফারাক ৯ বছর। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতায় মেস ও অন্য খরচ মিলিয়ে মাসে তিরিশ টাকা বরাদ্দ ছিল। ঘটনাচক্রে অজিতের মাসখরচ গল্পে ২৫ টাকা। ব্যোমকেশ প্রসঙ্গে নিজেই বলেছেন, ‘ওগুলি নিছক গোয়েন্দা কাহিনী নয়। প্রতিটি কাহিনীকে আপনি শুধু সামাজিক উপন্যাস হিসাবেও পড়তে পারেন।’ আর সেই নায়ক ঘোরাফেরা করে স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর এক অস্থির সময়ের মধ্যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মধ্য ও উত্তর কলকাতা জুড়ে, মানুষের অতর্কিতে হওয়া বিপদ, ওঁত পেতে থাকা আতঙ্কের মধ্যে। এই রকম দাঙ্গাধ্বস্ত কলকাতার ছবি ‘বিষের ধোঁয়া’ উপন্যাসেও।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যের অন্যতম অস্ত্র তাঁর ভাষা। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘জাতিস্মর’ থেকে শুরু করে মোট ২২টি ইতিহাসগন্ধী লেখায় ভাষার গাম্ভীর্য দিয়ে আশ্চর্য মায়াজাল তৈরি করেছেন বাংলা সাহিত্যের এই লেখক। ইতিহাসগন্ধী লেখার গাম্ভীর্যের সঙ্গে রয়েছে বরদার বৈঠকী কথনকৌশল।
আসলে সাহিত্যের আদর্শ থাকে নিজের জায়গায়। কিন্তু তাতে সংসার চলবে কীভাবে? ১৯৩৭-এ বই লিখে বার্ষিক আয় ১৮০০ টাকা। হিমাংশুনাথ রায় ওরফে হিমাংশু রায় তখন ‘বম্বে টকিজ’-এর কর্তা। চিত্রনাট্যকার হিসেবে বম্বে যাওয়ার প্রস্তাবটা আগে পেয়েছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন যাননি, কিন্তু এখন গেলেন। গেলেন মুম্বই। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সিনেমার গল্প লিখেছেন ইংরেজিতে। ‘ভাবী’, ‘বচন’, ‘দুর্গা’, ‘কঙ্গন’, ‘নবজীবন’, ‘আজাদ’, ‘পুনর্মিলন’— বম্বে টকিজ-এ সাতটি ছবির সঙ্গে জড়িয়েছেন শরদিন্দু। সেই পর্বের স্মৃতিচিহ্ন পাওয়া যায় ‘ঝর্ণা’, ‘চিড়িকদাস’, ‘কিসের লজ্জা’, ‘বোম্বাই কা ডাকু’ প্রভৃতি গল্পে। বম্বে টকিজ-এর পরে কিছুদিন আচারিয়া আর্ট প্রোডাকশনেও কাজ করলেন। পরে ফ্রিলান্স।
শরদিন্দুর গল্প নিয়েও চলচ্চিত্র কম হয়নি। বাংলায় ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘রাজদ্রোহী’ বা ‘শজারুর কাঁটা’র আগেই শরদিন্দুর নিজের করা চিত্রনাট্যে ‘দেবদূত’ ও ‘বিষের ধোঁয়া’ পরিচালনা করেন লেখকের দ্বিতীয় পুত্র অতনু। ‘ঝিন্দের বন্দী’ তপন সিংহ করবেন জেনে খুব খুশি হন। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’ শরদিন্দুর পছন্দ হয়নি। কারণটা বোধহয়, লেখক শরদিন্দু নিজের সৃষ্টিকে খুঁজে পাননি ছায়াছবিতে। ব্যোমকেশ কেন বক্সী, তার কারণ এক সাক্ষাৎকারে এক বার বলেওছেন শরদিন্দু, কায়েতদের বুদ্ধি বেশি! ঘটনাচক্রে, ফেলুদা কিন্তু কায়স্থই, মিত্র! নাটকও লিখেছেন, ‘বন্ধু’, ‘লালপাঞ্জা’, ‘ডিটেকটিভ’ প্রভৃতি। ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭০ সালে মুম্বইয়ে ছেলের বাড়িতে মৃত্যু হয় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের।