
শেষ আপডেট: 24 December 2023 20:59
হুগলি হিন্দমোটরের দেবাই পুকুর রোড থেকে হরিয়ানার পঞ্চকুলা। এই দীর্ঘপথকে ছোট করে টেবল টেনিসে নতুন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হলেন পয়মন্তী বৈশ্য। ২১ বছরের এই প্রতিভাবান মেয়েটি এর আগে বড় কোনও সাফল্য পাননি। কিন্তু তারকার তারকা ঐহিকা মুখোপাধ্যায়কে ফাইনালে হারিয়ে পয়মন্তী হয়ে উঠলেন নয়া জ্যোতিষ্ক।
মহিলাদের জাতীয় সিনিয়র টেবল টেনিসে খেতাব পাওয়ার পরে বিমানে নয়, বরং সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে ট্রেনে করেই ফিরেছেন মেট্রো রেলে কর্মরতা পয়মন্তী। যিনি জাতীয় টিটি-র আসরে হারিয়েছেন তাঁর থেকে সিনিয়র অর্চনা কামাথ এবং সৃজা আকুলাকেও। ফাইনালে ঐহিকাকেও দাঁড়াতেও দেননি।
নীরবে, একেবারে অন্তরালে ছিলেন পয়মন্তী। তাঁর জন্য তেমন কোনও বড় উদ্যোগ দেখা যায়নি সংস্থার আধিকারিকদের। তাঁদের মধ্যে নতুন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন নিয়ে সেই আবেগও দেখা যায়নি। তবে টিটি-র এক কর্তা দেবাশিস চক্রবর্তী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন উদীয়মান প্রতিভাকে। দেবাশিসও জানিয়েছেন, পয়মন্তীর দারুণ প্রতিভা। ওর যা জেদ, তাতে আরও এগোবে।
এবার জাতীয় টিটিতে পয়মন্তী মোট চারটি সোনার পদক পেয়েছেন। মহিলাদের টিম ইভেন্ট ছাড়াও সিঙ্গলস, ডাবলসে সুতীর্থা মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে, আর মিক্সড ডাবলসে আকাশ পালকে নিয়ে খেতাব জিতে ফিরেছেন। এই সাফল্যও নজিরবিহীন বাংলার বুকে।
পাঁচবছর বয়সে টিটি-তে হাতেখড়ি। প্রথমে বাংলার নামী প্রাক্তন তারকা অনিন্দিতা চক্রবর্তীর কাছে শিখতেন। তারপর অভিষেক মুখোপাধ্যায়ের কাছে গত ৫ বছর ধরে শিখে আরও উন্নতি করেছেন সপ্রতিভ এই মেয়েটি। তবে বাড়ির সকলের কাছে তিতলির (পয়মন্তীর ডাকনাম) আইকন টেবল টেনিসের কিংবদন্তি চেন্নাইয়ের শরথ কমল।
পয়মন্তী অবশ্য এত বড় সাফল্যের পরেও উচ্ছ্বাসহীন। বাড়িতে ফোন করলে মা ভারতী বৈশ্যও বললেন, সবে সাফল্য এসেছে, মেয়েকে আরও এগোতে হবে। দেশের হয়ে পদক আনলে বিরাট ব্যাপার হবে। বাবা প্রণব কুমার বৈশ্যের সঙ্গেই তিতলি গিয়েছিলেন স্থানীয় একটা দাবা প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে। কারণ সারা পাড়ার গর্ব এই মেয়েটি। তাঁর কৃতিত্ব বিশেষভাবে উৎসর্গ করেছেন কোচ অভিষেককে। পরিশ্রমী কোচ অভিষেক মুখোপাধ্যায় বালির নিশ্চিন্দা চারুপ্রভা চক্রবর্তী টেবল টেনিস সেন্টারে পয়মন্তী গত একবছর ধরে শিখছেন। আগে হিন্দমোটরে বিবেকানন্দ ক্লাবেও অভিষেকের কাছেই চারবছর ধরে তালিম নিয়েছেন নামী প্রতিভা।
পয়মন্তীর কোচ রবিবার সন্ধ্যায় বলছিলেন, ‘পয়মন্তীর সবচেয়ে বড় গুণ ও খুব মনোযোগী ও একনিষ্ঠ। এমন কোনওদিন হয়নি, যা বলেছি, সেটি করেনি। ওর ওই নিষ্ঠাই এতদূর এগিয়ে দিয়েছে। তবে নিজের আর্থিক আনুকূল্য না থাকায় বিদেশে টুর্নামেন্ট খেলতে যেতে পারেনি। তারপরেও দেশের নামী তারকাদের হারিয়ে সাফল্য পাওয়া সহজ ছিল না। তবে চিনে বিশ্বকাপে দেশের হয়ে খেলতে গিয়ে ওর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।’ প্রসঙ্গত, সবে মাত্র মেট্রো রেলে চাকরি পেয়েছেন এই তরুণী। বাবা একটা সাধারণ প্রাইভেট ফার্মে কাজ করেন।
হুগলির আরও একজন নামী কোচ সৌমেন মুখোপাধ্যায়ও জানালেন, ‘পয়মন্তী দারুণ একনিষ্ঠ এক ছাত্রী। তারপর কোচ অভিষেকের পরিশ্রম ওকে আরও এগিয়ে দিয়েছে। ২০১৫ সালে হিন্দমোটরের ক্ষুদিরাম গ্রাউন্ডে ভর দুপুরবেলায় মায়ের সাইকেলের ক্যারিয়ারে চেপে অনুশীলনে গিয়েছে দিনের পর দিন। এই অধ্যাবসায়ের কারণেই এতটা পথ পেরিয়েছে।’
বাংলার নতুন টিটি প্রতিভা উঠে এলেন উল্কার গতিতে। যিনি আরও স্বপ্ন দেখাবেন বাংলার টিটিতে। যে মেয়েটির বাড়িও আরও এক খ্যাতনামা ক্রীড়াবিদ, ইংলিশ চ্যানেলসহ সাত সাগর পার করা বুলা চৌধুরীর বাসভবনের কাছেই।