
শনিবার যুবভারতীতে বড় ম্যাচের একটা দৃশ্য।
শেষ আপডেট: 13 July 2024 19:29
সত্যিই বাংলার ফুটবলের বেহাল দশা। কেন প্রাক্তনদের বড় অংশ বাংলার ফুটবলের দৈন্যতা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করেন, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল শনিবারের ডার্বি ম্যাচ।
এই ম্যাচে দুই প্রধান মিলিয়ে মোট ৮জন বাঙালি ফুটবলার খেললেন। এমনিতেই আইএফএ জানিয়েছে, চলতি লিগে কোনও বিদেশি খেলতে পারবেন না। সেই কারণেই স্বদেশি দল নিয়ে সব দলই মাঠে নামছে। দুই প্রধানও তার ব্যতিক্রম নয়। অথচ মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের কোনও ফুটবলার ‘ফাঁকা জমি’ পেয়েও সেটিকে কাজে লাগাতে পারেননি।
মোহনবাগানে নিখাদ স্থানীয় ফুটবলারদের মধ্যে ছিলেন চারজন, অভিষেক সূর্যবংশী, ফারদিন আলি মোল্লা, দীপেন্দু বিশ্বাস, রাজা বর্মণ। লাল হলুদ বাহিনীতে বঙ্গসন্তানদের তালিকায় ছিলেন দেবজিৎ মজুমদার, মনোতোষ চাকলাদার, হীরা মণ্ডল, তন্ময় দাসরা। ম্যাচে এমন কোনও দাগ কাটতে পারলেন না, যাতে সমর্থকরা তাঁদের কথা মনে রাখবে। পাড়াতেও ফিরে গেলেও তাঁদের খেলা নিয়ে নয়, তাঁরা শুভেচ্ছা পাবেন ইস্টবেঙ্গলের জয়ের জন্য। হয়তো এই জয়ে তাঁদেরও অবদান রয়েছে, কিন্তু সেটির শতকরা ভাগ ফেল করার সমান!
বাংলার ফুটবলার কেন উঠে আসছে না, এই নিয়ে আমাদের যা সেমিনার হয়েছে, সেটি বিশ্বরেকর্ডের সমান। তারপরেও দিশা দেখানোর কেউ নেই। আইএফএ চেষ্টা করলে কী হবে তাদের সঙ্গে কলকাতার তিন প্রধানের সম্পর্ক দিনদিন খারাপ হচ্ছে। সেটি আগেও ছিল, তারপরেও কর্তাদের মধ্যে সদিচ্ছা ছিল, কিন্তু এখন কর্তাদের মধ্যে সস্তা সাফল্যই কাম্য।
গত মরশুমে বাংলার দলের তিন সাফল্য উল্লেখ করে আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছিলাম। ইস্টবেঙ্গল জিতেছিল সুপার কাপ, মোহনবাগান জিতেছিল আইএসএলের লিগ-শিল্ড (অপরাজিত ফাইনালের আগে পর্যন্ত) এবং মহামেডান জেতে আই লিগ। কিন্তু এই জয়ে বাংলার ফুটবলারদের অবদান সিকিভাগ। সব সাফল্য এসেছে নয় ভিনরাজ্যের ফুটবলারদের জন্য, নয় বিদেশি তারকাদের জন্য। তারপরেও আমরা বলি, বাংলার ফুটবলের জয়জয়কার। ভাড়া করা সৈন্য এনে যুদ্ধ জেতার মধ্যে কোনও কৃতিত্ব নেই।
আগেকার সময় বাদই দিন, সত্তর থেকে নয়ের দশক পর্যন্ত বাংলার ফুটবলাররাই বেশি ছিল ভারতীয় দলে। ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমস দলের প্রথম এগারোতেও বাংলার সাত ফুটবলার ছিলেন। বর্তমানে দূররীন কেন, টর্চলাইট দিয়ে দেখতে হবে বাংলার ফুটবলারের সংখ্যা।
এই নিয়ে ভারতের নামী প্রাক্তন গোলরক্ষক ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘‘এই কারণেই তো আর মাঠে যেতে ভাল লাগে না। আমরা ডার্বি-ডার্বি করি, কিন্তু আমাদের ঘরের ছেলেরাই ভাল খেলতে পারে না। এত সুযোগ পাওয়ার পরেও যদি নিজেদের প্রমাণ না করতে পারে, কবে আর করবে?’’
আসল কথাটি মনে হয় বললেন প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার ফুটবলের স্বর্ণযুগের আরও এক সোনার ছেলে দ্য ওয়ালকে জানিয়েছেন, ‘‘আগে কী আর বাংলায় অ্যাকাডেমির বন্যা ছিল? কিন্তু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুটবল হতো। বেশি হতো স্কুলগুলোতে, আন্ডারহাইট ফুটবলে সাড়া পড়ে যেত পাড়ায় পাড়ায়। সেই খেলাটাকেই তুলে দেওয়া হয়েছে। কারা তুলে দিয়েছে, সেটি আমি বলব না। কিন্তু কাদের উদ্দেশে বলছি, সেটি নিশ্চয়ই সবাই বুঝতে পারবে!’’
অলোক মুখোপাধ্যায়, বিকাশ পাঁজি, অতনু ভট্টাচার্যদেরও মনে হচ্ছে, ‘‘বাংলার ফুটবলের অবস্থা সুখের নয়। আগে যে ফুটবলারদের মধ্যে নিজস্ব দক্ষতা ছিল সেটি অনস্বিকার্য, কিন্তু পাশাপাশি তারাও অনেকে উঠে এসেছিল সুব্রত কাপ থেকে। এখন তো অনেক ফুটবলারই ইলিয়ট শিল্ডই খেলতে চায় না। বাংলা থেকে কোনও স্কুল দল সুব্রত কাপে খেলার সুযোগই পায় না।’’
অনেকেই দোষ দিয়েছে আইএফএ-কেও। তাদের ধারণা, আইএফএ নিজেদের একটা অ্যাকাডেমি করুক। সারাবছর ধরে বাছাই করা ফুটবলারদের নিয়ে ট্রেনিং করাক বিশেষজ্ঞ কোনও কোচকে দিয়ে। আইএফএ এই ব্যাপারে উদ্যোগ না নিলে বাংলার ফুটবলে মরা গাঙে জোয়ার আসবে না।