.jpeg)
দিগ্বেশ রাঠী
শেষ আপডেট: 17 April 2025 14:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রহস্য স্পিনারদের মুশকিলটা হচ্ছে, আস্তিনের লুকনো তাস একবার ফাঁস হয়ে গেলে জেল্লা ম্যাড়মেড়ে হয়ে যায়। পুরনো বলের মতো চটে যায় রং।
তবু সাবেকি স্পিনার হতে না চেয়ে উঠতি ক্রিকেটারদের অনেকেই অজন্তা মেন্ডিস, সুনীল নারিনদের আরাধ্য বলে মনে করেন। এভাবেই ক্রিকেটের বাঁধানো সড়কের পাশ কেটে উত্তরসূরী হিসেবে উঠে আসেন বরুণ চক্রবর্তীরা। বলের ঘূর্ণি, গতি পরিবর্তন, পিচকে কাজে লাগানোর ধরন—সবদিক দিয়েই তাঁরা অনন্যতা, স্বকীয়তা অর্জন করেন। রহস্য স্পিনের ‘রহস্যে'র আয়ু কতদিন—তাই নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিলেও নিরস্ত হন না কেউই৷
এই একই দুর্গম পথের পথিক দিগ্বেশ রাঠী। ঝাঁকড়া চুলের বোলার। খেলছেন লখনউ সুপার জায়ান্টসের হয়ে। তাঁর বোলিং নিয়ে যতটা না চর্চা, তার চেয়ে বেশি বিতর্ক, আওয়াজ উঠেছে সেলিব্রেশনকে ঘিরে। ব্যাটসম্যানদের আউট করে কখনও নোটবুকে লেখার স্টাইলে উচ্ছ্বাস প্রদর্শন করছেন, কখনও ব্যাটসম্যানদের মুখের সামনে হাতে সই করার মেজাজে বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছেন।
চমকের পর চমক। ডেলিভারি, উৎসব—সবকিছুতে ট্যুইস্ট। আজ নয়। দিগ্বেশের কেরিয়ার শুরুর সময়টিও ছিল একদম আলাদা। বোলার নয়, ব্যাটসম্যান হতে চেয়েছিলেন তিনি৷ নিজের ব্যাটিং শেষ হলে নেটে বাকি খেলোয়াড়দের বল করতেন। আর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন সুনীল নারিন। তখন তিনি সদ্য আইপিএলে যোগ দিয়েছেন। কেকেআরের হয়ে মাঠে নামছেন। নারিনের টেকনিক অনুসরণ করে প্র্যাকটিসে কাজে লাগাতে চাইতেন দিগ্বেশ।
আর এখানেই রহস্য স্পিনার হিসেবে যাত্রা শুরু। তাঁর কথায়, ‘আমি কোনওদিনই স্পিন বোলিংয়ের বেসিক নিয়ম শিখিনি৷ কেউ শেখায়নি৷ আমি রহস্য স্পিন ভালবাসতাম। কারণ ওটা তখও পর্যন্ত সেভাবে ব্যবহৃত বা চর্চিত হয়নি৷ জনপ্রিয়ও না৷ তা ছাড়া সিনিয়র ব্যাটসম্যানদের ধাঁধায় বোকা বানিয়ে আউট করতে রোমাঞ্চ হত। দিল্লির দিলশাদ গার্ডেনের একটি কমপ্লেক্সে খেলতাম। তখনই রবিন বিস্ত আমায় ব্যাট ছেড়ে স্পিন বোলিংয়ে মন দিতে বলেন।’
মিস্ট্রি বোলারদের দুনিয়াটা ঠিক কেমন? দিগ্বেশের বক্তব্য, আসল প্রাণভোমরা যেহেতু বোলিংয়ের রহস্যময়তা, তাই সেটা পাঁচকান হলে কিংবা বাকি দুনিয়ার সামনে ফাঁস হয়ে পড়লে মুশকিল৷ তাই রহস্য বোলাররা পরস্পর নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চালান। বাকিদের দলে নেন না বা বাকিদের দলে যান না। দিগ্বেশের কথায়, ‘মুম্বই ইন্ডিয়ান্স ম্যাচে মুজিব-উর-রহমানের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলি৷ উনিও এটাই মনে করেন। গত বছর কেকেআরের বরুণ চক্রবর্তীর সঙ্গে আলাপ চালাই৷ তাঁরও একই মতামত।’
যদিও কোচদের একটা বড় অংশ রহস্য স্পিনারদের কৃৎকৌশল বদলাতে চান৷ সাবেকি অফ স্পিন, লেগ স্পিনে মন দেওয়ার পরামর্শ আসে। কিন্তু দিগ্বেশ রাঠীর বক্তব্য, ‘আমি একেবারেই অফ স্পিন পছন্দ করি না৷ দিল্লির ক্রিকেট এতটাই দ্রুতগতির যে, অফ স্পিন করলে খুব বেশি ২ থেকে ৩ ওভার বোলিংয়ের সুযোগ পাওয়া যায়৷ তারপর ব্যাটাররা জারিজুরি ধরে ফেলে এবং টার্গেট করতে শুরু করে। হাঁকাতে থাকে চার, ছক্কা। পিচের কন্ডিশন, মাঠের আকার কোনওকিছু প্রভাব ফেলে না।’
নিজের বেড়ে ওঠার জন্য, আইপিএলে সুযোগ পাওয়ার জন্য দিল্লি প্রিমিয়ার লিগকে কৃতিত্ব দিয়েছেন দিগ্বেশ। সাম্প্রতিক সময়ে আশুতোষ শর্মা, প্রিয়াংশ আর্যর মতো একঝাঁক তরুণ খেলোয়াড় রাজ্যওয়াড়ি ক্রিকেট লিগ থেকে উঠে এসেছেন৷ দিগ্বেশের উত্থানও একই সরণি বেয়ে। বলেছেন, ‘ডিপিএল দারুণ মঞ্চ। যদি কেউ দিল্লির হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে নামার সুযোগ না পায়, তাহলে এই লিগকে কাজে লাগাতে পারে।’
দিগ্বেশের সঙ্গে সঙ্গে আইপিএলে নজর কেড়েছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রিয়াংশ শর্মা। পিঞ্চহিটার হিসেবে যিনি স্পটলাইটে এসেছেন। চলতি টুর্নামেন্টে পাঞ্জাব কিংসের ওপেনারকে আউট করে লাগামছাড়া উচ্ছ্বাস প্রদর্শন করেন দিগ্বেশ৷ এর কোনও বিশেষ কারণ? দিগ্বেশের স্বীকারোক্তি, ‘আমি জানতাম যেভাবে আর সবাইকে বল করে এসেছি, প্রিয়াংশকে সেভাবে বল করলে কোনওদিন ওকে আউট করতে পারব না। তাই লখনউ ম্যাচের আগের দিন কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার ও বিজয় দাহিয়া স্যারের সঙ্গে এক ঘণ্টা সময় কাটাই। নতুন ভেরিয়েশনে শান দিই। জানতাম প্রিয়াংশ আমার গুগলি পড়ে ফেলবে। কারণ ও ভীষণই প্রতিভাবান খেলোয়াড়। তাই ঠিক করি, আমার একটা বল ঘূর্ণি হবে। আর তারপরের বলটাই হবে গুগলি। এভাবেই ওকে আউট করেছিলাম আমি।’
রহস্য স্পিনারের শক্তি যে স্রেফ আস্তিনে লুকোনো তাস নয়, মগজাস্ত্রও বটে, প্রমাণ করছেন ঝাঁকড়া চুলের দিগ্বেশ রাঠী।