শেষ আপডেট: 10 March 2020 15:22
এই বিষয়ে আলোচনার আগে একটা ছোট্ট ঘটনা তুলে ধরা যাক। কল্যাণী স্টেডিয়ামে ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে জয়ের পর ড্রেসিংরুমে ঠিক কী হল? দেখা গেল ফুটবলাররা বসে রয়েছেন। কেউ মাটিতে, কেউ বেঞ্চে। সঙ্গে কোচ কিবু ভিকুনা, সাপোর্ট স্টাফ-সহ কর্মকর্তারা। সামনের জায়ান্ট স্ক্রিনে একের পর এক ভিডিও ফুটে উঠছে। প্রথম দেবজিৎ, তারপর পাপা বাবাকার দিওয়ারা, ফ্রান মোরান্তে, ফ্রান গঞ্জালেজ, জোসেবা বেইতিয়া, ধনচন্দ্র সিং, আশুতোষ মেহতা হয়ে ভিডিও থামল কিবু ভিকুনাতে গিয়ে। ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে তাঁদের শুভেচ্ছা জানালেন স্ত্রী, বান্ধবীরা। আর তখন টাফ গঞ্জালেজও চোখের জল সামলাতে পারছেন না। সবাই একে অন্যের ভিডিওতে হাসছেন, হাততালি দিচ্ছেন, জড়িয়ে ধরছেন। দোলের আনন্দ ভাগ করে নিতেও স্পেন থেকে এসেছেন বেইতিয়া, গঞ্জালেজ, মোরান্তেরদের স্ত্রী, বান্ধবীরা। সবাই চুটিয়ে রং খেলেছেন।
এটাই হয়তো ছবি। এই ছবিটাই হয়তো বলে দেয় কেন এত সফল হচ্ছে মোহনবাগান। কেন ফুটবলাররা একটা ছন্দে খেলছেন। কেন জেতার এত প্রবল ইচ্ছে। ফুটবলটা যে টিমগেম, সেটা কেন বারবার প্রমাণ করছেন তাঁরা।
কোন কোন ক্ষেত্রে বাকিদের থেকে এগিয়ে এই দলটা? কী ভাবেই বা চার ম্যাচ আগে লিগ জিতে গেল মোহনবাগান?
প্রথমেই বলা যেতে পারে নিজের সম্পূর্ণ একটা অন্য ধারা ভারতের মাটিতে নিয়ে এসেছেন স্প্যানিশ কিবু। এই খেলা ভারতের মাটিতে বহুদিন দেখা যায়নি। এই দলের প্রধান বিষয় হল প্রেসিং ফুটবল। নিজেদের পায়ে বল থাকলে পাস খেলে খেলে সামনের দিকে এগোও। আর যখন প্রতিপক্ষের পায়ে বল, তখন সেই বল কাড়তে ঝাঁপিয়ে পড়। বিপক্ষকে এক ফোঁটাও সুযোগ দিও না। এই এক মন্ত্রেই সফল বাগান। আইলিগের প্রথম থেকে এই একই ছবি দেখা গিয়েছে। শুধুমাত্র প্রথম একাদশের ফুটবলাররা নন, রিজার্ভ বেঞ্চও এই সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। এটাই কিবুর সাফল্য। সেইসঙ্গে মাঠের বাইরে মাটির মানুষ কিবু। অহঙ্কার দেখান না। বাস্তবে থাকতে চান। আর তাই শেষ কিছু ম্যাচে সেরকম দৃষ্টিনন্দন ফুটবল না খেলতে পারলেও মূল্যবান পয়েন্ট কিন্তু তুলে নিয়েছে দল।
সেইসঙ্গে প্রশংসা প্রাপ্য সাপোর্ট স্টাফদের। যেভাবে ম্যাচের পর ম্যাচ ফুটবলাররা সুস্থ হয়ে খেলছে, তার কৃতিত্ব কিন্তু তাঁদেরই। এই বয়সেও আশুতোষ মেহতা কিংবা ধনচন্দ্র গতিতে পরাস্ত করছেন তাঁদের থেকে অনেক ছোট প্লেয়ারকে। এই ম্যাচ ফিটনেস, স্ট্রেন্থ ধরে রাখতে পারছে বলেই সফল হচ্ছে বাগান। পরপর দু’মাস সেরা কোচ হওয়ার পরেও তাই কিন্তু কিবু সেই ট্রফি সাপোর্ট স্টাফদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন।
মোহনবাগানের এই সাফল্যের আর একটা কৃতিত্ব প্রাপ্য কর্মকর্তাদেরও। জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডো তাঁরা যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা বোধহয় আর কোনও দল করতে পারেনি। পাপা বাবাকার দিওয়ারা ও তুরসুনভের অন্তর্ভুক্তি এই দলকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। সত্যিই এই বছর বাগানের বিদেশিরা বাকি দলগুলির তুলনায় অনেক এগিয়ে। বাবা যে গোলটা কত ভাল চেনেন তা তাঁর লাগাতার ৯ ম্যাচে ১১ গোল করা দেখে পরিষ্কার। আর তুরসুনভ আসায় বাগানের আক্রমণ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। যে ম্যাচেই সুযোগ পেয়েছেন নিজের ১০০ শতাংশ দিয়েছেন। আর শুধু বিদেশি প্লেয়াররাই নয়, সঙ্গে রয়েছেন নওদম্বা নওরেম, শেখ সাহিল, ভিপি সুহের, আশুতোষ মেহতা, ধনচন্দ্র সিং, শঙ্কর রায়ের মতো ভারতীয়রা। এই দলে এত ভাল ফুটবলার রয়েছে, যে চুলোভার মতো প্লেয়ারকে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকতে হচ্ছে।
তবে ভাল প্লেয়ার থাকলেই কিন্তু লিগ জেতা যায় না। তার জন্য দুরকার একটা সুস্থ ড্রেসিং রুম। সেটা এবার বাগানে রয়েছে। এই ফুটবলাররা একে অন্যের সাফল্য উপভোগ করেন। কেউ স্বার্থপর খেলা খেলেন না। তাঁরা জানেন, আসল কথা লিগ জয়। না জিততে পারলে কিন্তু কেউ ব্যক্তিগত প্রতিভার দাম দেবে না, আর এই টিমগেমটা দলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারাই হয়তো কিবু ভিকুনার সবথেকে বড় সাফল্য। এই টিমগেমের ঝলক দেখা যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। মাঠের মধ্যে খেলায়, ড্রেসিং রুমে। আর তাইতো বাকি সবার থেকে অনেকটা উপরে থেকে আইলিগ জিতে নিয়েছে গঙ্গাপাড়ের ক্লাব।
কল্যাণীতে আইজলকে হারানোর পরেও দেখা গেল সেই দৃশ্য। ফুটনলাররা ঘাড়ে তুলে নিলেন কিবুকে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেল সেই শান্ত চেহারা। ফুটবলাররা উৎসব করছেন। আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছে সবুজ-মেরুন গ্যালারি। কিন্তু মাটিতে পা কিবুর। একটা লক্ষ্য পূরণ হয়ে গিয়েছে। এবার দ্বিতীয় লক্ষ্য তাঁর সামনে। পরের ম্যাচই ডার্বি। সম্মানের সেই ম্যাচ জিততে চান তিনি। জানেন বাকি চার ম্যাচ জিতলে পয়েন্ট তালিকায় হাফসেঞ্চুরি হয়ে যাবে বাগানের। ভারতে লিগের ইতিহাসে কোনও দল যা করতে পারেনি। সেটাকে পাখির চোখ করেই হয়তো আগামীকাল থেকে খাতা, পেন নিয়ে বসে পড়বেন বাগানের স্প্যানিশ কোচ। ট্রফি এসে গিয়েছে। এবার রেকর্ড ছোঁয়ার পালা।