
শেষ আপডেট: 9 September 2020 14:39
গত রাশিয়া বিশ্বকাপেই প্রমাণ হয়েছিল, শুধু বড় তারকাদের নামে জয়গান হয় না, হয় তথাকথিত ছোটদের নামেও। তিনি অবশ্য ছোট তারকা নন, বরং ব্যতিক্রমী এক মহাতারকা। তিনি ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্ব সেরা হয়তো করতে পারেননি, কিন্তু তাঁর কারণে ফের ক্রোয়েশিয়া খেতাবের কাছে গিয়েছিল।
তিনি এক স্বপ্নদিশারী, সেই কারণেই ব্যালন ডি’অরের মতো দুর্লভ সম্মানও তিনি পেয়েছিলেন ওই বছরই। সেই লুকা মদরিচের জন্মদিন আজ ৯ সেপ্টেম্বর, ৩৫টি বসন্ত পেরিয়ে জীবনের সেরা চরিত্র, তাঁর মা রাদোজকাকে একটি চিঠি লিখলেন এই সুপারস্টার।
আমার মা,
মা, তোমার মনে পড়ে যেদিন ক্রোয়েশিয়া স্বাধীন হলো, যেদিন আমরা যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা দেশ হিসেবে চিহ্নিত হলাম। পাগলের মতো কী সব বলছি দেখো, তুমি তো আমার মা, তুমিই তো আমায় জগতের আলো দেখিয়েছো, আর তোমাকেই কী না আমি মনে করাচ্ছি।
ওফ বিশ্বকাপটা জিতলে আরও কী সব না হতো! এতেই এই অবস্থা। রাশিয়া বিশ্বকাপে এবার রানার্স হয়ে যেদিন জাগ্রেবে পৌঁছলাম, ভিড় রাজপথে আমাকে নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখে তোমার কথা মনে পড়ছিল। তোমার মুখটা সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ভিড়ের মধ্যে আমি তোমাকে খুঁজেছি মা। তোমার সেই কথাটি সেদিনও কানে বাজছিল, ‘লুকা তোর দাদুকে ওরা মেরে ফেলেছে, চল পালাতে হবে, চল...।’
সেদিন তুমি আমায় সাহস দিয়েছিলে। সেদিন যদি আমাদের শান্ত মদ্রিচি গ্রাম থেকে পালিয়ে ৪০কিলোমিটার দূরে জাদান শহরে না আসতাম, হয়তো আমাদের পুরো পরিবারকে সার্ব ও যুগোস্লাভিয়া সেনাবাহিনীর হাতে গুলি খেয়ে মরতে হতো। না হলে ভাবো না, যে দাদুর সঙ্গে সকালেও বাড়িতে বসে পাস্তা খেলাম, যে আমাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে গেল, সেই মানুষটি মাঠে গরু চড়াতে গিয়ে আর ফিরলো না। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম, স্কুলের পাশে একটা দোকানে রেডিওতে ঘোষণা হচ্ছে, ক্রোয়েশিয়া স্বাধীন, মুক্ত। কিন্তু এ কিসের স্বাধীন, কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখলাম, যুগোস্লাভ সেনারা ক্রোটদের নির্বিচারে মারছে। তখনই আমার ফুটবল মাঠের এক বন্ধু বললো, ‘লুকা তোর দাদুকে সেনারা গুলি করে খুন করেছে। গ্রেনেডে ঝাঁঝরা করে দিয়েছেন এফোর-ওফোর।’
দাদু আমার জীবনের অনেকটা। হয়তো তাঁকে আমি বছর পাঁচেকের বেশি পাইনি। কিন্তু তুমি তো জানো মা, দাদু আমাকে কত ভালোবাসতো। একপাল গরুর মধ্যে বলটাকে ছেড়ে দিয়ে বলতো, ‘লাকি (আমার ডাকনাম) দৌড়, দেখি তুই কেমন ওদের মধ্যে থেকে বল নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারিস।’ সবসময় হয়তো পারতাম না, আবার কোনও কোনওদিন পারতামও। দাদু আমায় কোলে তুলে নিতো, আর বলতো, একদিন তোকে মস্ত বড় ফুটবলার হতে হবে।
কতসব মনে পড়ছে, কত অতীতের কথা। আচ্ছা মা, একটা প্রশ্ন করবো তোমায় এতদিন পরে, তুমি কেন আমার নাম দাদুর নামে রেখেছিলে? দাদুর নামও তো ছিল, লুকা মদরিচ সিনিয়র। কেন মা? আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারি, এর উত্তর। আমার মনে হয় দাদুই তোমাকে ও বাবাকে বলেছিলেন আমার নাম তাঁর নামে রাখতে। কেননা দাদুর ওভাবে ভয়ঙ্কর মৃত্যু হবে তিনি হয়তো জানতেন, বুঝতে পেরেছিলেন! তাঁর নামে তাঁর নাতি বিশ্বখ্যাত হবে, এটা মনে হয় তিনি স্বপ্ন দেখতেন। চোখের সামনে দিনের পর দিন যুদ্ধ দেখেছি, সেনাদের বুটের টহলের আওয়াজ শুনেছি, কামানের গোলা দেখেছি, মাঝেমধ্যে খুব ভয় করতো, মনে হতো এভাবে বেঁচে থাকা অর্থহীন। তবে এমন অনেককিছুই আমার জীবনে ঘটেছে, আমি জানতামও না তার অর্থ, শুধু তোমাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতাম, তুমি আমাকে বুকে জড়িয়ে আগলে রাখতে, আর বলতে, ‘লাকি তুই ওসব নিয়ে ভাবিস না, আমি তো রয়েছি তোর পাশে।’
মা, তোমার ওই ভরসাটা না পেলে আজ হয়তো সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারতাম না। বাবা যেদিন ক্রোয়েশিয়া সেনাবাহিনীতে চাকরি নিলেন, সেদিন তুমি খুব কেঁদেছিলে। আর বাবাকে বলছিলে, ‘তুমি কোনওদিন কোনও নিরপরাধ লোককে তোমার বন্দুক দিয়ে আঘাত করো না, তাঁদের স্বপ্নকে ছুঁড়ে ফেলে দিও না। এতে তোমার ও পরিবারের ক্ষতি হবে, আগে আমায় কথা দিয়ে যাও, না হলে আমি আমাদের সন্তানদের নিয়ে তোমার থেকে অনেক দূরে চলে যাবো।’ বাবা সেদিন কথা দিয়েছিল তোমায়। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে আমাদের প্রেসিডেন্ট গোলিন্দা গ্রাবার কিটারোভিচ তোমার কথা জিজ্ঞাসা করে বলছিলেন, ‘লুকা তোমার মা কেমন আছেন? তাঁর খোঁজ তুমি নাও তো? আনন্দ-উচ্ছ্বাসের দিনে মা-কে ভুলে যেও না যেন, আজ মা তোমাদের পাশে না থাকলে এই মঞ্চটাই পেতে না।’ প্রেসিডেন্টের ওই কথা শুনে আমারও চোখে জল এসে গিয়েছিল।
আমি খুব লিকপিকে ছিলাম, মেসিকে নিয়ে এতো কথা হয়, সবাই বলে মেসির হরমোনজনিত সমস্যা ছিল ছোটবেলায়। আমার হয়তো তা ছিল না, কিন্তু আমিও খুব রোগা ছিলাম, জোরে হাওয়া হলে ভয় হতো। জাদার শহরে যে উদ্বাস্তু হোটেলে আমাদের অস্থায়ী ঠিকানা ছিল, সেই হোটেলের পার্কিং লটে আমি বল নিয়ে খেলে বেড়াতাম সারাদিন। আর দাদুর সেই কথাটি কানে বাজতো, ‘লাকি, দৌড় দেখি, কেমন করে গরুদের মাঝখান দিয়ে বল নিয়ে যেতে পারিস।’ গাড়িগুলিকে আমি গরুই ভাবতাম, আর সব গাড়িকে পাশ কাটিয়ে ড্রিবল করে পৌঁছে যেতাম রাজপথে। আমার জীবনে তোমার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ফুটবলার মদরিচকে বিখ্যাত করার পিছনে আমি তমিস্লাভ বাসিচের কথা বলবো।
মা, তুমি তো জানো আমার বাবা আমাদের সময় দিতে পারেননি, তিনি চলে গিয়েছিলেন আর্মিতে। কিন্তু এই বাসিচ আঙ্কল (আমি স্যারও বলতাম তাঁকে) না থাকলে তোমার ছোট্ট লুকা কোনওদিন বড় ফুটবলার হতে পারতো না। আমি মাঝেমধ্যে আমার বাবার নাম বলতে গিয়ে বাসিচ আঙ্কলের কথা বলে ফেলতাম! তোমাকে এতদিন পরে বলছি, তুমি আমায় ক্ষমা করো দিও, কিন্তু আমরা যখন রক্তাক্ত অবস্থার মধ্যে দিয়ে বড় হচ্ছি, যখন প্রতিদিন গ্রেনেডের সঙ্গে আমাদের সহাবস্থান, সেইসময় বাসিচ আঙ্কল না থাকলে আমরা হারিয়ে যেতাম। আমাকে বড় ফুটবলার করেছে, আমার ফুটবলের হাতেখড়ি ওঁর কাছে। আমি যে ফুটবলে লাথি মারতে শিখেছি, তার কৃতিত্বও ওই লোকটার, যে কিনা কোনওদিন বিয়ে পর্যন্ত করলো না স্রেফ ফুটবলকে ভালোবেসে। ক্রোয়েশিয়ার এন কে জাদার ক্লাবে প্রথমদিনের ট্রেনিংয়ের কথা খুব মনে পড়ছে। আমি একটা ফুটবলে শট মারতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম, সবাই হেসে উঠেছিল, কিন্তু বাসিচ স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, লুকা ফুটবল খেলতে হলে শক্তপোক্ত হতে হবে, ভালো করে খেতে হবে। তারপর তিনি আমাকে ক্লাবে রেখে গ্রোথ ও পুস্টি তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন। তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘ভয়সন্ত্রস্ত সামাজিক জীবনে ফুটবলই পারে বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে।’ জাদার ক্লাবের যিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন, সেই জোসিপ বাজলো আমাকে একবার বলেছিলেন, লুকা তুমি সারাক্ষণ পার্কিং লটে ফুটবল খেলো কেন? মাঠে এসে খেলবে, পাশে দাঁড়িয়ে বাসিচ স্যার আমার হয়ে বলেছিলেন, ‘লুকার ড্রিবলিং একদিন বিখ্যাত হবে ওর এই পার্কিং লটে খেলার জন্য।’ জোসিপ স্যার খুব হেসে বলেছিলেন, ‘গড ব্লেস ইউ সন, সত্যিই তুমি একদিন বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়ে উঠবে।’
জীবনে অনেককিছুই আমার মনের মতো ঘটেনি। খেলতে চেয়েছিলাম বার্সেলোনায়, খেললাম রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে। খেলতে চেয়েছিলাম ক্রোয়েশিয়ার নামী ক্লাব জাকদুকে, আর খেললাম তাদেরই চির প্রতিপক্ষ ক্লাব জাগ্রেবের হয়ে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম যেদিন আমাকে ক্রোয়েশিয়ার মানুষ ‘প্রতারক’ বলে দেওয়ালে আমার নামে লিখেছিল, ‘লুকা মদরিচ একটা আবর্জনা।’ সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল, মনকে বলছিলাম, আমি কী এমন করলাম, যার জন্য আমাকে এমন বদনাম শুনতে হচ্ছে, কারোর প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানো কী অপরাধের? কেউ আপনার কোনও উপকার করলো, তার প্রতিদান মনে রাখা ভুল কাজের মধ্যে পড়ে?
না হলে যে মামিচ স্যার আমাকে জাগ্রেব থেকে টটেনহ্যাম হটস্পারে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন, তিনি ওই টাকা জাগ্রেবকে না দিয়ে নিজের পকেটে ভরেছেন কিনা আমি কী করে জানবো। আমার ভুল হয়েছিল, মামিচ স্যারকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা। তাঁর হয়ে আমি ফুটবলার ট্রাইবুনালে বলেছিলাম, মামিচ স্যার আমার সঙ্গে কত টাকার চুক্তি করেছেন, আমার মনে নেই। সত্যিই মনে ছিল না। কিন্তু মিডিয়া এমনভাবে আমাকে মিথ্যেবাদী সাজালো যে দেশের মানুষ ভাবলো আমি মামিচকে আড়াল করতে চাইছি। কিন্তু কী করে ভুলবো ওই লোকটা যদি আমার পাশে দুঃসময়ে না থাকতো, তা হলে রিয়ালে আমি যে টানা ছয়বছর খেলছি, তা পারতাম না। মামিচ স্যারের ছয়বছরের জেল হয়, তাঁর নামে অভিযোগ ছিল, তিনি ফুটবলারদের ট্রান্সফার ফি-র অর্থ ক্লাবকে না দিয়ে নিজে নিয়ে নিতেন। এমনকি সরকারকে রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত করেছিলেন।
জীবনে অজান্তে বহু ভুল হয়ে গিয়েছে। কখনও পাশে থেকে স্ত্রী আমাকে শুধরে দিয়েছে, কখনও তিন সন্তানের মুখ চেয়ে মনে হয়েছে এই সিদ্ধান্তটা না নিলেই পারি। তবে মা, তোমার ত্যাগ, তোমার আদর্শে বড় হয়েছি বলেই এতদিন পরে এমন একটা মঞ্চ খুঁজে পেয়েছি। এতদিন ক্রোয়েশিয়া ফুটবল মানে ছিল সুকের, বোবান, প্রোসিনেস্কি স্যারদের উপস্থিতি। এবার থেকে সবাই কিন্তু বলবে আমাদের কথাও। তোমার অবাধ্য ছেলের কথা না হয় ছেড়েই দাও, আমি বলব মানদুকিচ, পেরিসিচ, রকিটিচ, সুবাসিচদের কথাও। আমি বিশ্বাস করি, ফুটবলে একা কেউ কিছু করতে পারে না, এই দল না পেলে ফাইনালে ওঠা সম্ভবই ছিল না। তাও ভালো লাগে এই সুন্দর ও স্বপ্নের দলের আমি ক্যাপ্টেন ছিলাম।
তোমায় অনেক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আর চুম্বন।
তোমার লুকা।
পুনশ্চ : লুকা মদরিচের এই চিঠি পুরোটাই কাল্পনিক। তিনি লেখেনও নি তাঁর মা-কে, কিন্তু লুকার জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে এমন এক কাল্পনিক চিঠির হদিশ তাঁর জন্মদিনে দিতে পেরে মহান ফুটবলারের প্রতি চরম শ্রদ্ধার্ঘ্য।