অশোক মালহোত্রা
কে বলে টেস্ট ক্রিকেট শেষ হয়ে গিয়েছে, কে বলে লাল বলের দিন শেষ?
গাব্বা টেস্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আইপিএলের মতো টেস্ট ক্রিকেটেরও সমান আকর্ষণ রয়েছে। শেষ কবে কোন টেস্টে ৫০ ওভার আমি টেনশনে ছিলাম, মনে করতে পারছি না। সারাক্ষণ একটা কী হয়, কী হয় ভাব! টিভি চলছে, পায়চারি করে যাচ্ছিলাম সমানে। জয়ের পরে তাই আমিও বাকি ভারতীয়দের মতো উচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিলাম। সত্যিই, কোনও একদিন দেশের হয়ে আমিও টেস্ট ক্রিকেট খেলেছিলাম, সেটি ভেবেই গর্ব হচ্ছে।
টিম রাহানের জন্য সারা ভারত একসূত্রে বাঁধা হয়ে গিয়েছিল। এরকম একটি টেস্ট ম্যাচ দেখার জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটা যায়। অসাধারণ একটা প্রেক্ষাপট, ৩২৮ রান করলে ম্যাচ জেতা যাবে, এই ফিগার দেখে আমিও বাকি ভারতীয়দের মতো আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কারণ ব্রিসবেনের ইতিহাস অন্য কথা বলে এসেছে চিরকাল। এই মাঠে অস্ট্রেলীয়রা শেষ হেরেছে ৩২ বছর আগে কোনও এক শক্তিধর ক্যারিবিয়ান দলের সামনে। তাই আমিও ভাবিনি এভাবে ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়বে রাহানে, পুজারা, ঋষভরা।
এই দলের সিংহভাগ কৃতিত্ব অজিঙ্ক্যা রাহানের। এই ছেলেটিকে যত দেখি মুগ্ধ হই। ওর মধ্যেও মুম্বইয়ের ঘরানা রয়েছে দারুণভাবে। কিন্তু মুম্বইকরদের মধ্যে একটা অহংবোধ থাকে, তারা মনে করে বাকি রাজ্যের ক্রিকেটারদের থেকে তাঁরা ক্রিকেটে অনেক বেশি পটু। কিন্তু রাহানে অন্য ধাঁচের মানুষ। এত সাধারণ চলাফেরা, দেহের ভাষা যে সতীর্থদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এত দক্ষ একজন ক্রিকেটার হয়ে মাটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে, এটাই ওর ‘ইউএসপি’।
বিরাট কোহলি এই দলের সুপারস্টার, ওর কাছে সবাই ঘেঁষতে পারে না। এটা চিরকাল ভারতীয় ক্রিকেটে হয়ে এসেছে। ‘স্টারডম ইমেজ’ বজায় রেখে চলে সতীর্থদের সঙ্গেও। কোহলিরও পছন্দের ক্রিকেটার রয়েছে এই দলে। সেই বৃত্তে প্রবেশ করতে পারে না পুজারা, রাহানে, সিরাজ, শার্দুলরা। রাহানেরা তো চিরকাল পাত্তা পাইনি এই দলে, উপেক্ষিত নায়ক হিসেবেই থেকে গিয়েছে। কিন্তু রাহানে দলের নেতা হতে সবাই জানপ্রাণ দিয়ে খেলেছে, সেটাই স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কারণ এই ভারতীয় দলটা ছিল ‘ওয়ান ফর অল, অল ফর ওয়ান...।’ প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকে। এটাই হওয়া উচিত যে কোনও দলে। নেতাকে যেন সবাই নিজের মনে করতে পারে, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারে খোলামেলা।
কোনও দলেই ওয়ান ম্যান শো হতে পারে, যেটি কোহলির দলে রয়েছে। বিরাট যা বলবে, তাই হবে। এই টিম কালচার রাহানের দলে নেই। থাকলেও সেটি সংক্রামক হয়নি। আমার মতো মনে হয় এবার চেতন শর্মার নির্বাচক টিম চাপে থাকবে। কারণ এমন কোনও দল করা যাবে না, যেখানে সিরাজ থাকবে না, শার্দুল থাকবে না, নটরাজন থাকবে না, সুন্দর থাকবে না।
এখনই দেশের নির্বাচকদের উচিত টেস্টের জন্য একটা সেট টিম তৈরি রাখা। আবার রিজার্ভ বেঞ্চকেও সাজিয়ে রাখতে হবে। যে দলই করা হোক না কেন, টেস্ট দলের নেতা করা হোক রাহানেকেই। কারণ শুধুই গাব্বা টেস্ট জয় নয়, রাহানের টেস্ট ক্যাপ্টেন্সি রেকর্ড দারুণ, পাঁচটি ম্যাচে চারটিতে জিতেছে, একটি ড্র হয়েছে। কোহলি যদি নিজে টেস্টের অধিনায়ক পদ রাহানকে দিয়ে দেয়, তা হলে তো জাতীয় নায়ক হয়ে যাবে, নির্বাচকরা দিলে কোহলির সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নিক। না হলে এই জয়ের পরে একটা ছেলেকে আবার সাধারণ সদস্যের মতো দেখলে সেটি অন্যায় হবে, তার প্রতি অবিচার করা হবে, যা ভারতীয় দলে চিরকাল হয়ে এসেছে। এই ফর্মুলা বদল হওয়া দরকার।