শুভ্র মুখোপাধ্যায়
বলো, বলো... বলো সবে...
শত বীনা, বেনু রবে...
ভারত আবার জগৎসভায়..
শ্রেষ্ঠ আসন লবে।
‘‘জাকার্তা এশিয়ান গেমসে এটাই ছিল আমাদের থিমসঙ। এই গান আমাদের করতে শিখিয়েছিলেন কোচ রহিম সাহেব। তিনি বলতেন, যখন তোমরা হারবে, এই গান গাইবে, দেখবে মনের জোর পাবে। আবার যখন জিতবে, সেইসময়ও এই গান গাইবে, দেখবে মন তরতাজা হয়ে উঠবে, মনের ভেতর একটা প্রাণশক্তি আসবে, সেটাই তোমাদের এগিয়ে যাওয়ার অক্সিজেন। আমার মনে হয় রহিম সাহেব যত ভাল কোচ ছিলেন, তত ভালই ছিলেন ফুটবলারদের মনোবিদ। তিনি জানতেন কী করে দলের ছেলেদের উদীপ্ত করতে হয়।’’
এই কথাগুলি প্রয়াত চুনী গোস্বামীর। তিনি নিজের আত্মজীবনী ‘খেলতে খেলতে’ বইতে এগুলি লিখে সবিস্তার ব্যাখ্যা করেছেন। আমরা জানতাম, চুনী গোস্বামী ভাল ফুটবলার ছিলেন, তিনি ছিলেন দক্ষ ক্রিকেটার। একই সঙ্গে তিনি ভারতীয় দলের হয়ে অধিনায়কত্ব করেছিলেন, আবার ক্রিকেটে বাংলা দলের রঞ্জি অধিনায়কও ছিলেন। কিন্তু তাঁর মধ্যে লেখক সত্ত্বাও সমানভাবে লুকিয়ে ছিল, তা প্রথম বোঝা যায় এই আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে। কী সুন্দরভাবে তিনি ১৯৬২ সালে এশিয়ান গেমসে ভারতীয় ফুটবল দলের সোনা জয়ের ইতিহাস তুলে ধরেছেন বইতে। যেন তিনি সামনে সবকিছু দেখতে পাচ্ছেন, অনর্গলভাবে ধারাভাষ্য দিয়ে চলেছেন।
চলতি মাসেই আমরা ৫৮ বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তাতে জিতেছিলাম এশিয়াড ফুটবলের স্বর্ণপদক। এক জয়ের রূপকথা। যে টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে ভারতীয় দল খোলসে ঢুকে গিয়েছিল। সেই ঘটনা তুলে ধরে চুনী জানিয়েছেন, ‘‘সেবার সাড়া জাগিয়ে গিয়ে হারতেই আমাদের নিয়ে পড়ে গেল স্থানীয় ভারতীয়রা। আমরা প্র্যাকটিস করতে নামতেই দুঁয়ো দিত, বলত, ‘‘কী রে, হেরো টিম, খেলতে হবে না, বাড়ি চলে যা...।’’ এসব শুনতাম, আর গেমস ভিলেজে ফিরতাম ওই গান ধরে, বলো, বলো.. সবে..। তারপরে দুটি ম্যাচ ছিল বি গ্রুপে, একটা তাইল্যান্ডের বিপক্ষে, আরও একটি জাপানের সঙ্গে। তাইল্যান্ড ম্যাচের আগে আবার আমার সঙ্গে কোচ রহিম সাহেবের বনিবনা তৈরি হল, কারণ দলগঠন। তিনি চান দলে থাকুক আফজল, কিন্তু আমি চাই আরও এক হায়দরাবাদী ইউসুফ খাঁ। আমি কোচকে বোঝালাম আমি, পিকে, বলরামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলতে পারবে একমাত্র ইউসুফ। ওকে প্রথম এগারোয় রাখুন, না হলে দল জিতবে না। তিনি আমার কথায় শেষমেশ রাগ করেই রাজি হলেন, আমরা ম্যাচটিও জিতলাম ৪-১ গোলে। দুটি গোল করেছিল পিকে (ব্যানার্জি), একটি আমি, অন্যটি আমাদের প্রিয় বলরাম।’’
পরের ম্যাচেও ভারত জাপানকে হারায় ২-০ গোলে, গোল দুটি ছিল পিকে ও বলরামের। সেই ঘটনা আজও যেন দেখতে পাচ্ছেন ৮৮ বছরের তুলসীদাস বলরাম। উত্তরপাড়ায় গঙ্গাবক্ষের ফ্ল্যাটে বসে উদাস দৃষ্টিতে বলছিলেন, ‘‘জানেন ভাই, আজ ওসব দিন মনে করলে খারাপ লাগে। চোখের সামনে সব বন্ধুদের চলে যেতে দেখলাম। সেই দলের শুধু আমি ও অরুণ (ঘোষ) বেঁচে আছি। তাই তো সেদিন অরুণকে ফোন করে জানতে চাইলাম, ওরে বন্ধু, কেমন আছিস? কীভাবে বাড়িতে সময় কাটাস?’’ এও জানালেন, ‘‘৪ সেপ্টেম্বর এলে বুকের ভেতরটা হু হু করে, কতসব সোনার স্মৃতি, চোখ বন্ধ করে শুধু ভাবি, আর দেখি, ওই তো চুনী দৌড়চ্ছে, প্রদ্যুৎ বর্মণ গোলের নিচে দাঁড়িয়ে বল সেভ করছে, অরুণ ওভারল্যাপিং করছে, আর বিচ্চু প্রদীপটা ড্রিবলিং করছে, আর আমাকে বলছে, ওরে বলু, যা গোলটা করে দিয়ে আয়..!’’ বলার সময় চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে প্রাক্তন ডাকাবুকো ফরোয়ার্ডের।কোনও কোনও সময় আক্ষেপ ঝরে পড়ে, বলেও ওঠেন, ‘‘জানেন তো আমাদের ওই দলের অনেকেই যোগ্য সম্মান পায়নি, যারা বলতে পারত, যারা লোক ধরতে পারত, তারাই পুরস্কার, সম্মান, টাকা পেয়েছে। যারা বলেনি, তাদের দেওয়া হয়নি। না হলে পিটার থঙ্গরাজ কী পেয়েছে, প্রদ্যুৎ বর্মণের রেলের চাকরি ছাড়া কী ছিল? কিংবা প্রশান্ত সিংহ, রামবাহাদুর, ইউসুফ খাঁ, আফজল খাঁ এদের কথা সেইভাবে জানালো হল না কেন, বলতে পারেন? নতুন প্রজন্ম তো ওঁদের মতো মহান ফুটবলারদের চিনতেই পারল না।’’ বলার সময় গলার শির ফুলে যায় বলরামের।
চুনী গোস্বামী আমাদের মধ্যে নেই। নিজের বইয়ে সব লিখে গিয়েছেন, সেই বই চিরজীবন থেকেও যাবে। কিন্তু যে মানুষটি রয়েছেন, যিনি চুনীদের প্রিয় সতীর্থ ছিলেন, যাঁর ডিফেন্স ভারতীয় ফুটবলের সর্বকালের সেরা। সেই অরুণ ঘোষ হাওড়ার মন্দিরতলার বাড়িতে বসে জানালেন, ‘‘সেমিফাইনালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে চুনী আমাদের হয়ে দুটি গোল করে জিতিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ২-২ করে ম্যাচটিতে লড়াই এনেছিল জার্নেল (সিং)। ও গোল না করলে ওই রুদ্ধশ্বাসে ম্যাচে কী হতো, কেউ জানে না। শেষদিকে আমরাও টেনশন নিতে পারছিলাম না। কারণ সারা মাঠ আমাদের বিপক্ষে চলে গিয়েছিল।’’
সেই ফাইনাল ম্যাচের কথা মনে পড়ে? আশির্ধ্বো ওই প্রখ্যাত ডিফেন্ডার খানিক চুপ করে বলে ওঠেন, ‘‘ওই ফাইনাল চোখে তুলসী পাতা দেওয়ার আগে পর্যন্ত মনে রাখব, আহা কী খেলেছিলাম আমরা! তার চেয়েও ওই ম্যাচে দলগঠন নিয়ে আমরা সত্যিই সমস্যায় ছিলাম। কারণ গোলে থঙ্গরাজ ফ্লুতে আক্রান্ত ছিল বলে খেলছিল প্রদ্যুৎ (বর্মণ), আর সেমিফাইনাল ম্যাচে জার্নেল বিশ্রী কপালে চোট পেল। ফাইনালে ওকে নামানো হবে কিনা, সেই নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু চুনী কেন ভারতের অন্যতম সেরা ফুটবল ক্যাপ্টেন, সেটি আরও একবার বুঝিয়েছিল। এমনিতে ওঁর মগজ ছিল শান দেওয়া তরোয়ালের মতো, খুব দ্রুত ভাবতে পারত। চুনীই ম্যাচের আগের রাতে কোচকে জানাল, জার্নেলের কপালে চোট, ওর হেড দিতে সমস্যা হতে পারে, ওর জায়গায় স্টপার খেলান অরুণকে (অর্থাৎ আমাকে), বলরাম খেলবে লেফটআউটে, আর জার্নেলকে সেন্টার ফরোয়ার্ড করে দিন। কী অবাক করার মতো ঘটনা, দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জার্নেলই আমাদের জয়ের গোল করেছিল। প্রথম গোলটি ছিল পিকে-র।’’
সেই সোনার দলে সব সদস্যই আর নেই, চলে গিয়েছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু এই দুই জীবন্ত কিংবদন্তি চলতি মাস এলে এক ঘোরের মধ্যে থাকেন, বলরাম ও অরুণ ঘোষ। নিজের মনেই কথা বলেন, হাতড়ে বেড়ান সেই সোনালি ইতিহাস। ফেরার পরে পুরো দলকে নিয়ে গ্র্যান্ড হোটেলে পার্টি হয়েছিল। সেদিনও সেই গানই তাঁদের ধমনীতে শিরশিরে রক্ত বইয়ে দিয়েছিল, ‘‘বলো, বলো, সবে.. সেতু বীনা বেনু রবে...।’’ উড়েছিল তেরঙ্গা, হয়েছিল জাতীয় সঙ্গীতও। সেই জন্যই তো বলরাম বলে ওঠেন, ‘‘মানুষ চলে যায়, থেকে যায় ইতিহাস, একদিন আমরাও চলে যাব, কিন্তু ওই ইতিহাস মোছা যাবে না।’’