শুভ্র মুখোপাধ্যায়
কথায় রয়েছে কঠিন সময়ে যে পাশে দাঁড়ায়, সেই আসল বন্ধু। কিন্তু কলকাতা ময়দানে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের মধ্যে ‘বন্ধুত্ব’ কথাটি বড়ই ক্লিশে, সেখানে ‘চিরন্তন বৈরিতা’র আল্পনাই বরাবর আঁকা হয়ে এসেছে।
দুটি ক্লাবের ১০০ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার সময়ে কোথাও যেন বন্ধুত্বের পরশ পাওয়া যাচ্ছে! দুটি দলের রেষারেষি, ছায়াযুদ্ধের পাশে এই বন্ধুত্বের রেখা কোথাও যেন গিয়ে সমান্তরালভাবে মিলে যাচ্ছে।
দুটি দলের মেঠো লড়াই, আকচাআকচি, কর্তাদের রন্ধে রন্ধেও প্রবেশ করে গিয়েছে। কোনও আলোচনায় দুটি দলের কর্তারা বসলে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হবে না, ঝগড়াঝাটি হবে না, কোনওদিন হয়নি। সব থেকে বড় কথা, একটা সময় কলকাতা ময়দানে সরগরম থাকত দলবদলের সময়।
দলবদলে কে কাদের টেক্কা দেবে, কে কাদের বড় তারকাকে নিজেদের জালে নিয়ে আসবে, সেই নিয়ে নিরন্তর গবেষণা হতো। এরকম হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে সকালে বাড়ি থেকে জনৈক ফুটবলার বেরিয়েছেন ইস্টবেঙ্গলে সেই করবেন বলে, সেই ফুটবলারই রাতে ফিরেছেন মোহনবাগান কর্তাদের গাড়িতে চেপে।
এটাই দস্তুর ছিল একটা সময় কলকাতা ফুটবলে। যেখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের গন্ডিগুলো নিমেষে ছোট হয়ে আসত। অস্বচ্ছতা, রহস্যময়তার মধ্যেও নিদারুণ একটা উন্মাদনা ছিল। সমর্থকদের মধ্যে টেনশন থাকত সেই দড়ি টানাটানি নিয়ে।
ইস্টবেঙ্গলের জীবন-পল্টু কিংবা সুপ্রকাশ গড়গড়িরা, কিংবা তারওপরে নিতু সরকার-স্বপন বলরাও দলবদল অপারেশনে হাত পাকিয়েছেন। মোহনবাগানও পিছিয়ে থাকবে কেন! তাঁদের দলের নমস্য ব্যক্তিরা, যেমন শৈলেন মান্না, ধীরেন দে থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে টুটু বসু-অঞ্জন মিত্র, তারওপরে দেবাশিস-টুম্পাইরাও ‘ছোটখাটো অপারেশন’ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছেন।
এবারই যেন চাকাটা ঘুরে গেল একশো আশি ডিগ্রি। পেশাদারিত্বের মোড়কে চাকচিক্যের রাংতায় প্রবেশ করে দুটি দলের পরিচালন সমিতি যেন ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই...’ স্লোগানে এগিয়ে চলেছে। সেই যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে পিছনে ফেলে দুটি দলের কর্পোরেট কেস্টবিষ্টুরা একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর ব্রত নিয়েছেন। যেন কোম্পানির দ্রব্যবস্তুর ‘আমদানি-রপ্তানি’ চলছে।
ঠিক সেই ভাবেই এস সি ইস্টবেঙ্গল যখন ভারতীয় ফুটবলারদের পারফরম্যান্সে বীতশ্রদ্ধ, এবং সাহেব কোচের কথায় তাঁদের বাতিল করে দিতে চলেছে। সেইসময় দলের হাল ফেরাতে, সমর্থকদের সামনে লজ্জা নিবারণ করতে চিরপ্রতিপক্ষ ক্লাবের কাছে সাহায্যের আর্জি জানাচ্ছে।
এও তো ভারতীয় ফুটবলের এক চরম রসিকতা। যে দলের সমর্থকদের মধ্যে বড় ম্যাচের আগে মধুর সম্ভাষণ বিনিময় হয়ে আসছে। যারা একে অপরকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেখায়, সেই ক্লাবের কর্তারা অন্য ক্লাবে ফোন করে ফুটবলার চাইছেন, সেটিও শতবর্ষের ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কাছে এক সোনালি মাইলফলকই। তাঁদের দাবি তিন-চারজন ফুটবলার, সেই তালিকায় রয়েছেন সালাম রঞ্জন সিং, ধীরাজ সিংদের মতো তরুণরা।
মোহনবাগানও, থুরি এটিকে-এমবি কর্তারাও এই সন্ধিক্ষণকে ইতিহাস করে রাখার মনোবাসনায় লাল হলুদ কর্তাদের কাছে আবেদনের লিখিত রূপ চেয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, লিখিত দিলে সেটি মোহনবাগান ক্লাবের জাদুঘরেও সোনার ফ্রেমে সাজিয়ে রাখা যাবে। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এটাই বুঝবে যে চিরন্তন লড়াইয়ের পরে একদিন ‘প্রেম বিনিময়’ও হয়েছে।
রবি ফাউলারের দলের টানা পয়েন্ট হারানো দেখে সমর্থকরা আতঙ্কে কাঁপছেন। এটা ভেবেই যে, ব্রিটিশ কোচ আর কত নিচে নামাবেন তাঁদের দলকে। কেউ আর খোঁজও রাখতে চাইছে না, দলের ফের খেলা কবে। এমন দিন অন্তত আসেনি লাল হলুদ শিবিরে কোনওদিন।
ফাউলার নিজের আনা বিদেশীদের সুরক্ষিত রাখতে ভারতীয় ফুটবলারদের ‘বলির পাঁঠা’ করার বন্দোবস্ত করেছেন সাজিয়ে গুছিয়ে। ওই ভূমিপুত্রদের নিমেষে অযোগ্য, কোনওদিন ভাল কোচের কোচিং করেনি, এমন অজুহাতে ছাঁটাইয়ের শিলমোহর লাগিয়ে দিয়েছেন। কর্তারাও কোচের কথাকে গুরুত্ব দিয়ে ভাল-মন্দ বিচার না করেই তাঁদের রিলিজ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন।
জানুয়ারিতে নতুন উইন্ডো খোলার অছিলায় তাঁদের বাতিল করে দিলেই কী রাতারাতি দলের হাল ফিরে যাবে, এমন গ্যারান্টি দিতে পারবেন তো কোচ? পের আবার ব্যর্থতার অতলে প্রবেশ করে যদি অন্য অজুহাত দাঁড় করান, সেইসময় ইনভেস্টর আধিকারিকদের পিঠ বাঁচানো যাবে তো, সেই প্রশ্নটাও করা থাকল। জবাব তো সময়ই দেবে।