
শেষ আপডেট: 20 March 2024 18:00
ময়দানও বিস্ময়ে সেদিন হতবাক হয়ে গিয়েছিল। কোচ ও প্রিয় ছাত্রের মৃত্যুদিন একই দিনে হতে পারে! পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় ও কৃশানু দে-র জীবনের চিত্রনাট্য কি ফুটবল ঈশ্বর একই সময়ে লিখতে বসেছিলেন।
সেদিনও সকাল থেকে টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল। দুপুর দেড়টা নাগাদ শোনা যায়, কৃশানুর অকাল বিদায় হয়েছে। সারা ময়দান শোকস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কৃশানু মানে ময়দানের এক ফুটবল আবেগ।
১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে ভারতীয় ফুটবল প্রথম টিভি দর্শনে মারাদোনা ম্যাজিক দেখেছিল। সেই ম্যাজিক ঘরোয়া ফুটবলে আরও একজন দেখাবেন, ময়দান খুঁজছিল এমনই একজনকেই।
সেটাই পেয়েছিল কৃশানুর মায়াবী, শৈল্পিক ফুটবলে। কলকাতার বর্ষার মাঠেও কৃশানু বলকে কথা বলাতে পারতেন। তাঁর পেরিফেরিয়াল ভিশন (মুহূর্তের মধ্যে সারা মাঠকে দেখে নেওয়ার ক্ষমতা) সমাদৃত ছিল, বিদ্যুতের গতিতে মাঠে সতীর্থরা কে কোন জায়গায় রয়েছেন, সেটি দেখে নিয়ে ডিফেন্স চেরা থ্রু বাড়াতে পারতেন তিনি।
কৃশানু না থাকলে বিকাশ পাঁজির ফুটবল জন্মই হতো না। কৃশানুকে পাশে না পেলে চিমা অতটা ভয়ঙ্করই হতেন না! কৃশানু মাঠে একইসঙ্গে দুটি কাজ করতেন। তিনি ছিলেন বলপ্লেয়ার, দলের ইঞ্জিন। আবার উইথড্রয়াল ফরোয়ার্ডও।
কৃশানুকে সবচেয়ে ভাল ব্যবহার করেছেন কোচ পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের আত্মজীবনীতে প্রিয় ছাত্রের তালিকায় ছিলেন পছন্দের রন্টু (কৃশানুর ডাকনাম)। পিকে-র কোচিংয়ে বড় ম্যাচে ফুল ফোটাতেন ভারতের মারাদোনা। পিকে-ই একবার বলেছিলেন, রন্টু বিদেশে জন্মালে বিশ্বকাপ খেলে ফেলত।
পিকের ভোকালটনিকের সময় মাথা নিচু করে বসে নিস্পৃহ হয়ে সবটাই শুনতেন কৃশানু। সবাই ভাবত তিনি রয়েছেন আপন জগতে, কিন্তু কোচ জানতেন, রন্টু বিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙার কৌশলের অঙ্ক কষছেন!
এটাই পিকে ম্যাজিক, এটাই কৃশানুর ফুটবল সত্তার বড় ক্যানভাস। ফুটবল মঞ্চে বারবার কোচ ও তাঁর প্রিয় ফুটবলারের জুটি মাত করেছে। জীবনের মঞ্চেও একইদিনে তাঁদের প্রস্থান জুটিকে আরও স্মরণীয় করে রেখেছে।
বুধবার ২০ মার্চে পিকে ও কৃশানুর একইদিনে মৃত্যুবার্ষিকী ময়দানের ফুটবল প্রেমীদের হৃদয় ব্যাথাতুর করে রেখেছে। কৃশানুর চিরবিদায় হয়েছিল ২০০৩ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে, আর কোচ পিকের জীবনের ছুটি হয়ে গিয়েছিল তার ঠিক ১৭ বছর পরে, ২০২০ সালে ৮৩ বছরে। কিন্তু তাঁদের ফুটবলবোধ ও জাদুর স্মৃতিতে আচ্ছন্ন সারা ময়দান। এদিন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের তরফে দুই ফুটবল ব্যক্তিত্বকেই স্মরণ করা হয়েছে। ফুল ও মালায় ঢেকে গিয়েছে তাঁদের ছবি।
প্রয়াত কিংবদন্তি কৃশানুর সুযোগ্য পুত্র সোহম বুধবার বিকেলে বলছিলেন, ‘‘ভাবতেই পারছি না ২১ বছর হয়ে গেল বাবি নেই। ২০ মার্চ সবসময় আমার কাছে একটা অভিশপ্ত দিন হিসেবে থেকে যাবে। কিন্তু ভাল লাগে যখন দেখি এতবছর পরেও ফুটবল ভক্তরা তাঁদের হৃদয়ের মণিকোঠায় বাবিকে এখনও বসিয়ে রেখেছেন। বাবির ফুটবল অনুরাগীদের ভালবাসাই আমার বেদনা ভোলাতে অনেকটা সাহায্য করেছে।’’